২৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার বিকেলে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রফেসর আলী রীয়াজ গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণে তার দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। তিনি বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মীয় সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে ভোটের ভূমিকা তুলে ধরেন।
রীয়াজের বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল জুলাই সনদ, যা তিনি মানুষের মৌলিক অধিকার স্পষ্ট করার উদ্দেশ্যে গৃহীত বলে ব্যাখ্যা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা ও অধিকারই এই সনদের ভিত্তি, এবং ২০২৪ সালে পরিকল্পিত গণঅভ্যুত্থান এই অধিকারকে পুনরায় দৃঢ় করার সুযোগ দেবে।
প্রফেসর রীয়াজের মতে, মুক্তিযুদ্ধের পর ৫৪ বছর পার হয়ে এখন আবার জনগণকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার সময় এসেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সুযোগকে হেলায় না হারিয়ে, ভোটের মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয়ের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব।
সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে যে, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ, তবে রীয়াজ উল্লেখ করেন, ঐ অধিকার দীর্ঘদিন ধরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। তিনি ভোটারদের আহ্বান জানান, যেন তারা তাড়াতাড়ি গণভোটে অংশ নেয় এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে অতীতের অনিচ্ছাকৃত দিক থেকে রক্ষা করে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন করে।
রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ও দায়িত্ব সংক্রান্ত রীয়াজের বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুসারে সবকিছু সম্পন্ন হতো, যদিও সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের অধিকার রাখেন। অন্য সরকারি পদ, যেমন নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, এবং বিচারিক সংস্থার নিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তবে সরকারপ্রধানের ইচ্ছা প্রাধান্য পায়।
ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত রীয়াজের মন্তব্যে তিনি জোর দেন, জুলাই সনদ সকল নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করবে এবং সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সমাজ গঠন করবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ধর্মের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে অন্যের থেকে আলাদা করবে না, ফলে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে।
মতবিনিময় সভায় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন, বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব জয়দত্ত বড়ুয়া, এবং খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি পিউস কস্তা সহ অন্যান্য প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভার সভাপতিত্ব করেন বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ভবেশ চাকমা।
প্রফেসর রীয়াজের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, আসন্ন গণভোটের ফলাফল দেশের সংবিধানিক কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। যদি ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা বেশি হয়, তবে জুলাই সনদ দ্রুত বাস্তবায়িত হয়ে ধর্মীয় সমতা ও মানবাধিকার সংক্রান্ত ধারাগুলি সংবিধানে সংযোজিত হতে পারে।
অন্যদিকে, বিরোধী গোষ্ঠী ও কিছু রাজনৈতিক দল এখনও সনদের কিছু ধারাকে সংবিধানিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছে এবং তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে। তারা ভোটের স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত তদারকি দাবি করেছে।
গণভোটের ফলাফল নির্ধারণের পর, সরকারকে সনদের ধারা অনুযায়ী আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। রীয়াজের মতে, এই প্রক্রিয়ায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই মূল চালিকাশক্তি হবে।
সামগ্রিকভাবে, ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভা সরকারকে জনমত জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ প্রদান করেছে এবং ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। রীয়াজের আহ্বান অনুসারে, ভোটের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ গঠন করা সম্ভব, এবং তা দেশের গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করবে।



