সির কীয়ার স্টার্মার, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী, ২০২৬ সালের প্রথম সপ্তাহে শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন চীনে সফর করেন। এটি থেরেসা মেরের ২০১৮ সালের সফরের পর প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর এবং দুই দেশের দীর্ঘকালীন কূটনৈতিক ‘আইস এজ’ শেষের লক্ষ্যে নেওয়া পদক্ষেপ। সফরের সময় স্টার্মার এবং শি জিনপিং উভয়ই দেশীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে বের করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
সির কীয়ার স্টার্মার সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাজ্যের আর্থিক, ফার্মাসিউটিক্যাল, স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং গাড়ি শিল্পের সক্ষমতা চীনা বাজারে তুলে ধরা। তিনি উল্লেখ করেন যে এই সেক্টরগুলোতে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম এবং চীনের সঙ্গে সহযোগিতা উভয় দেশের জন্য পারস্পরিক লাভজনক হতে পারে।
শি জিনপিংও সফরের সময় চীনের পশ্চিমা অর্থনীতির জন্য নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে অস্থির করে তুলছে, ফলে চীনকে আরও স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা তার লক্ষ্য।
যদিও সফরে কোনো বিস্তৃত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি, তবু যুক্তরাজ্য-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুনরায় সূচনা চিহ্নিত করে বেশ কিছু নির্দিষ্ট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভিসা, সেবা, স্বাস্থ্যসেবা, সবুজ প্রযুক্তি এবং আর্থিক সেক্টরে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য পারস্পরিক সমঝোতা করা হয়েছে। এই চুক্তিগুলো ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর চীনা বাজারে প্রবেশ সহজ করবে এবং চীনের যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সফরের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ঘোষণার মধ্যে একটি ছিল অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির চীনে ১৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১১ বিলিয়ন পাউন্ড) বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি। কোম্পানিটি আগামী চার বছর ধরে চীনে গবেষণা ও ওষুধ উৎপাদন বাড়াবে, যা তার চীনে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিনিয়োগ হিসেবে চিহ্নিত। এই পদক্ষেপটি ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরে যুক্তরাজ্য-চীন সহযোগিতার নতুন মাত্রা খুলে দেবে।
শক্তি ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের অক্টোপাস এনার্জি চীন বাজারে প্রবেশের জন্য স্থানীয় কোম্পানি পিসিজি পাওয়ার-এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব গঠন করেছে। দুই সংস্থা একসাথে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে, যা বিদ্যুৎ বাণিজ্যকে আরও কার্যকর করবে এবং চীনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যকে সমর্থন করবে। অক্টোপাসের দ্রুত বৃদ্ধির পটভূমিতে এই চুক্তি কোম্পানিটিকে বিশাল চীনা শক্তি বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেবে, যেখানে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও ডিজিটাল ট্রেডিংয়ের চাহিদা বাড়ছে।
অক্টোপাস এনার্জির সিইও গ্রেগ জ্যাকসন সফরে উল্লেখ করেন যে চীনের বিশাল স্কেল এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি সৌর, বায়ু এবং ব্যাটারি খরচকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি যুক্তরাজ্যের জন্য বড় সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যাতে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো চীনের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের প্রযুক্তি ও পণ্যকে আরও বিস্তৃত বাজারে নিয়ে যেতে পারে।
সারসংক্ষেপে, সির কীয়ার স্টার্মারের চীন সফর উভয় দেশের জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন সূচনা নির্দেশ করে। ভিসা, স্বাস্থ্যসেবা, সবুজ প্রযুক্তি এবং আর্থিক সেক্টরে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো ভবিষ্যতে ব্রিটিশ ব্যবসার চীনা বাজারে প্রবেশের পথ সুগম করবে এবং চীনের যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও অক্টোপাস এনার্জির মতো বড় কোম্পানির বিনিয়োগ ঘোষণাগুলো এই পুনরায় গড়ে তোলা সম্পর্কের বাস্তব ফলাফল হিসেবে দেখা যাবে, যা উভয় দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সমর্থন করবে।



