রাশিয়ার ক্রেমলিন বুধবার জুলেনস্কিকে আবার মস্কোতে শান্তি আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের এই মন্তব্য ইন্টারফ্যাক্সের মাধ্যমে রয়টার্সকে জানানো হয়। জুলেনস্কি এখনো এই আমন্ত্রণের কোনো উত্তর দেননি।
এই আমন্ত্রণটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রস্তাবের অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যার লক্ষ্য চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানো। রাশিয়া দাবি করে যে কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা সম্ভব। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে মস্কোতে স্বাগত জানিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে আস্থা পুনর্নির্মাণের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ নির্ধারিত হয়নি।
গত বছর একই ধরনের আমন্ত্রণে জুলেনস্কি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, তিনি এমন দেশের রাজধানীতে যেতে পারবেন না, যা তার নিজ দেশের ওপর ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। জুলেনস্কি পরিবর্তে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে কিইভে আসতে আহ্বান জানান। এই অবস্থান তখনই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ই যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সৈন্যদের দেহ বিনিময় করেছে। এই বিনিময়টি পারস্পরিক মানবিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে দেহ বিনিময়ের পরেও যুদ্ধের তীব্রতা কমেনি। উভয় পক্ষের মধ্যে শত্রুতা এখনও বজায় রয়েছে।
রাশিয়ার এই আমন্ত্রণের কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, পুতিন শীতকালে ইউক্রেনে নতুন আক্রমণ চালাবেন না। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর কিইভ ও মস্কোর মধ্যে বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে আক্রমণ না করার সমঝোতার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে ক্রেমলিন এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করে। এই অস্বীকৃতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় আবু ধাবিতে ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ আলোচনার ফলে যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে অগ্রগতি দেখা যায়, তবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মতবিরোধ অব্যাহত। বিশেষ করে ভূখণ্ডগত দাবি এবং যুদ্ধপরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দ্বিমত রয়ে গেছে। এই পার্থক্যগুলোই সংঘাতের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
শীতের তীব্রতায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ ইউক্রেনের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ককে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে কিইভকে নাগরিকদের শীতের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক সংকটের সম্ভাবনা বাড়ছে। সরকার তাপ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক সাহায্য আহ্বান করছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা এক্সইওএসে জানিয়েছেন, আবু ধাবিতে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পর পুতিন ও জুলেনস্কির মধ্যে সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সম্ভাবনা উভয় পক্ষের কূটনৈতিক চ্যানেলে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। তবে এখনও কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা স্থান প্রকাশিত হয়নি। বৈঠকটি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা শান্তি প্রক্রিয়ার মোড় পরিবর্তন করতে পারে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধি দলগুলো রবিবার আবার আবু ধাবিতে মিলিত হবে। এই বৈঠকে পূর্ববর্তী আলোচনার ফলাফল পর্যালোচনা করে নতুন পদক্ষেপ নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। উভয় পক্ষের নেতারা সংঘাতের অবসান এবং পুনর্গঠনমূলক কাজের জন্য সমঝোতা খুঁজতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সমঝোতা অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন অপরিহার্য হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড় সংঘাত হিসেবে এই যুদ্ধকে শেষ করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। রাশিয়া ও কিইভের মধ্যে ভূখণ্ড, যুদ্ধপরবর্তী শান্তি রক্ষাকারী বাহিনীর মোতায়েন এবং রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে জটিল আলোচনা চলছে। এই বিষয়গুলো সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত সমাধানের চাবিকাঠি হতে পারে।



