রমজান মাসের আগমনের প্রস্তুতিতে বহু নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়িয়ে চলেছে। এই ঋতুতে মোট আমদানি পরিমাণ পূর্বের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে, তবে গুদাম ও সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে লজিস্টিক চেইনে চাপ বাড়ছে।
বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের পর গন্তব্য ঘাটে দ্রুত খালাস করা সম্ভব না হওয়ায় লাইটার জাহাজগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য নোঙরে আটকে থাকে। একই সঙ্গে আমদানি বাড়ার ফলে লাইটার জাহাজের চাহিদা তীব্রতর হয়েছে, ফলে জাহাজের ঘাটতি আরও বাড়ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের গত মঙ্গলবারের তালিকা অনুযায়ী, নোঙরে ১০৪টি পণ্যবাহী জাহাজের মধ্যে ৪৬টি জাহাজে ভোগ্যপণ্য লোড রয়েছে। এই জাহাজগুলোতে মোট ২৩ লাখ ৪৬ হাজার টন ভোগ্যপণ্য রয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
গত বছর একই সময়ে বন্দরেই ২৬টি জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন ভোগ্যপণ্য ছিল। ফলে এক বছরের মধ্যে ভোগ্যপণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা ও পণ্যের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে।
মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত এই জাহাজগুলো থেকে প্রায় সাড়ে দশ লাখ টন পণ্য খালাস করা হয়েছে, তবে এখনও প্রায় তেরো লাখ টন পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এই পার্থক্য সরবরাহ শৃঙ্খলের গতি হ্রাসের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
সর্বাধিক আমদানি গমের ক্ষেত্রে হয়েছে। নোঙরে ২৫টি গমবাহী জাহাজে মোট সাড়ে তেরো লাখ টন গম পৌঁছেছে, যার মধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখ আটো হাজার টন ইতিমধ্যে খালাস করা হয়েছে। গমের উচ্চ পরিমাণ সরবরাহের মূলধারাকে প্রভাবিত করছে।
ছোলা, মসুর ডাল ও মটর ডালের জন্য সাতটি জাহাজে মোট দুই লাখ ত্রিশ ছয় হাজার টন পণ্য এসেছে, যার মধ্যে এক লাখ টন ইতিমধ্যে খালাস হয়েছে। তদুপরি, নয়টি জাহাজে চার লাখ উনত্রিশ হাজার টন তৈলবীজ পৌঁছেছে, যার মধ্যে আড়াই লাখ টন খালাস করা হয়েছে।
বন্দর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বড় জাহাজ থেকে গড়ে পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার টন ভোগ্যপণ্য লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। এই লাইটার জাহাজগুলো নদীপথে ঢাকা, বরিশাল, খুলনা এবং দেশের বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে পণ্য বিতরণ করে।
বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (ডব্লিউটিসিসি) পূর্বে প্রায় এক হাজার দুইশত লাইটার জাহাজ পরিচালনা করত, তবে বর্তমানে সংখ্যা কমে এক হাজার দুইশো বারের নিচে নেমে এসেছে। জাহাজের সংখ্যা হ্রাস সরবরাহের গতি আরও ধীর করে তুলেছে।
ডব্লিউটিসিসির ২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত দশ দিন থেকে দেড় মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন ঘাটে পণ্য খালাসের জন্য ২৬৫টি লাইটার জাহাজ আটকে রয়েছে, যার মধ্যে ১২২টি ভোগ্যপণ্যবাহী। এই পরিসংখ্যান লজিস্টিক জটিলতার মাত্রা প্রকাশ করে।
ডব্লিউটিসিসির তথ্য অনুযায়ী, এসএস ট্রেডিংয়ের মোট তেরোটি লাইটার জাহাজ এক থেকে দেড় মাসের জন্য গম নিয়ে নারায়ণগঞ্জ, নোয়াপাড়া ও কাঁচপুর ঘাটে আটকে আছে। এই দীর্ঘস্থায়ী আটকে থাকা জাহাজগুলো সরবরাহের সময়সীমা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ভোগ্যপণ্যের প্রবাহে এই ধীরগতি সরবরাহ ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত খুচরা মূল্যে চাপ বাড়াবে। গম ও ডালের মতো মৌলিক পণ্যের দামের ওঠানামা বিশেষত রমজান মাসে গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে।
অধিকন্তু, লাইটার জাহাজের ঘাটতি ও গুদাম সুবিধার অভাব দীর্ঘমেয়াদে আমদানি খরচ বাড়াবে, কারণ অতিরিক্ত লোডিং ও ডিকনস্ট্রাকশন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময় ও জ্বালানি ব্যয় হবে। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত দেশের বাণিজ্য ঘাটতিতে প্রতিফলিত হবে।
ভবিষ্যতে গুদাম ও সংরক্ষণ সুবিধার সম্প্রসারণ, লাইটার জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গঠন জরুরি। না হলে আমদানি পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহের গতি হ্রাস পাবে, যা বাজারে অস্থিরতা ও মূল্যবৃদ্ধি সৃষ্টি করতে পারে।
সংক্ষেপে, চট্টগ্রাম বন্দরতে ভোগ্যপণ্যের আমদানি দ্বিগুণ হলেও খালাসের ধীরগতি, লাইটার জাহাজের ঘাটতি এবং গুদাম সুবিধার অভাব সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও লজিস্টিক সমন্বয় দ্রুততর করা প্রয়োজন।



