নির্বাচন মৌসুমের আগমনে এআই‑সৃষ্ট নকল কণ্ঠস্বর ও ভুয়া সংবাদ ইন্টারনেটের গোপন যুদ্ধের রূপ নেয়, যা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করা এবং ভোটারদের মতামত গঠনকে লক্ষ্য করে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক মাসে এআই‑ভিত্তিক অপতথ্যের প্রচার হার অন্তত চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন, আইসিটি বিভাগ ও বিটিআরসি সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ এখনো পর্যাপ্ত নয়, যা স্বচ্ছ ও ন্যায্য নির্বাচনী পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
ডিজিটাল নজরদারি বাড়াতে নির্বাচনী সুরক্ষা বাহিনীর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, এআই‑প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি অনুসরণ করা এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, আইনগত বিধান ও নীতিমালা থাকলেও, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কারিগরি সক্ষমতা ও প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব সমস্যার মূল কারণ। নির্বাচনের দিন যত নিকটবর্তী, সাইবার অপরাধীরা ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
এআই‑সৃষ্ট ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তি নির্বাচনী ময়দানে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রের মধ্যে স্থান পেয়েছে। শীর্ষ নেতাদের মুখ ও কণ্ঠস্বর নিখুঁতভাবে নকল করে তৈরি করা ভুয়া বক্তব্য সামাজিক মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা ভোটারদের বিভ্রান্তি বাড়ায়। ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র গত জানুয়ারি মাসে নির্বাচন‑কেন্দ্রিক এআই অপতথ্য যাচাইয়ের ঘটনা ১৮‑এ পৌঁছেছে, যেখানে ডিসেম্বর মাসে মাত্র চারটি রেকর্ড করা হয়েছিল। অর্থাৎ এক মাসে এ ধরনের কনটেন্ট চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এআই‑এর অপব্যবহারের আরেকটি দিক হল ‘মাইক্রো‑টার্গেটিং’। নির্বাচনী প্রচারণায় ভুয়া ফটোকার্ডের ব্যবহার বাড়ছে; এসব কার্ডে দেশের প্রধান সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলের লোগো নকল করে ফটোশপের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। রিউমার স্ক্যানার সম্প্রতি একটি নকল ফটোকার্ড শনাক্ত করেছে, যেখানে মূল মিডিয়ার গ্রাফিক্স সম্পূর্ণভাবে নকল করা হয়েছে। এই ধরনের কন্টেন্ট ভোটারদের নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে লক্ষ্য করে পৌঁছে, যা তথ্যের বিকৃতি ও ভোটার আচরণে প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলছেন। এছাড়া, ভোটারদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও ভুয়া তথ্য শনাক্তের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা কঠিন।
আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে, এআই‑ভিত্তিক অপতথ্যের বিরুদ্ধে বিদ্যমান বিধান থাকলেও, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন ও প্রয়োগে ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, বিশেষজ্ঞ দল গঠন এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তদুপরি, সামাজিক মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে এআই‑সৃষ্ট কন্টেন্টের সনাক্তকরণ ও অপসারণে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে, যাতে ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধ করা যায়।
ভবিষ্যতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে সরকার, নির্বাচন কমিশন, সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এআই‑প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি বিবেচনা করে, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, দ্রুত ফ্যাক্টচেকিং এবং জনসচেতনতা কর্মসূচি চালু করা উচিত। এভাবে ভোটারদের সঠিক তথ্য সরবরাহ করে এবং ভুয়া কন্টেন্টের প্রভাব সীমিত করে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, এআই‑সৃষ্ট ভুয়া তথ্যের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে, আর নির্বাচনী সংস্থার প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত প্রস্তুতি এখনও পর্যাপ্ত নয়। ডিপফেক, নকল কণ্ঠস্বর, মাইক্রো‑টার্গেটিং এবং ভুয়া ফটোকার্ডের মতো কৌশলগুলো ভোটারকে বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা তৈরি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় এবং ভোটার সচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।



