নাইজেরিয়ার আফ্রোবিটের প্রতিষ্ঠাতা ফেলা কুটি, ১৯৯৭ সালে ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করার প্রায় ত্রিশ বছর পর, গ্র্যামি পুরস্কার অনুষ্ঠানে পোস্টহিউমাসভাবে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার পেয়ে ইতিহাস রচনা করেছেন। এই স্বীকৃতি গ্র্যামি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো আফ্রিকান শিল্পীকে দেওয়া হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সঙ্গীত জগতে তার প্রভাবের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ফেলা কুটির সৃষ্টিশীলতা ও রাজনৈতিক বিক্ষোভের মিশ্রণ ১৯৭০ ও ১৯৮০ দশকে আফ্রিকান সঙ্গীতের দিগন্তকে বদলে দেয়, তবে তার মৃত্যু পরেও তার সুর ও বার্তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেঁচে আছে। তার মৃত্যুর পর থেকে বহু শিল্পী ও সমালোচক তার কাজকে পুনরায় মূল্যায়ন করেছে, এবং আজ গ্র্যামি এই পুনর্মূল্যায়নের চূড়ান্ত স্বীকৃতি দিচ্ছে।
গ্র্যামি পুরস্কার সমাবেশে ফেলা কুটির পরিবার ও নিকটস্থ বন্ধুরা উপস্থিত ছিলেন, যেখানে তিনি পোস্টহিউমাসভাবে পুরস্কার গ্রহণের জন্য সম্মানিত হয়েছেন। পুরস্কারটি ১৯৬৩ সালে প্রথমবারের মতো বিং ক্রসবি-কে দেওয়া হয়েছিল, এবং এখন এটি ফেলা কুটির মতো একটি আইকনিক আফ্রিকান সঙ্গীতশিল্পীর নামেও যুক্ত হয়েছে।
ফেলা কুটির বড় ছেলে সেউন কুটি এই স্বীকৃতি সম্পর্কে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছেন, “ফেলা বহু বছর ধরে মানুষের হৃদয়ে বাস করে আসছে, এখন গ্র্যামি এটিকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, এটা দ্বিগুণ বিজয়।” তিনি আরও যোগ করেন, “এটি ফেলার গল্পে একটি ভারসাম্য আনছে, যা দীর্ঘ সময়ের অনুপস্থিতি পূরণ করছে।”
সেউন কুটি আরও উল্লেখ করেন যে, এই পুরস্কার শুধু তার পিতার জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবিক সংস্কৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ফেলা কুটির সঙ্গীত ও বার্তা বিশ্বব্যাপী মানবিক সংযোগকে শক্তিশালী করে।
ফেলা কুটির দীর্ঘদিনের বন্ধু ও ম্যানেজার রিকি স্টেইনও এই স্বীকৃতিকে “বিলম্বিত হলেও সঠিক সময়ে এসেছে” বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “অতীতে আফ্রিকান শিল্পকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যথাযথ স্থান দেওয়া হয়নি, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা পরিবর্তিত হচ্ছে।” স্টেইন এই পরিবর্তনের পেছনে আফ্রোবিটের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা ও আফ্রিকান সঙ্গীতের নতুন দিককে উল্লেখ করেন।
গ্র্যামি ২০২৪ সালে আফ্রিকান সঙ্গীতের উত্থানকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘বেস্ট আফ্রিকান পারফরম্যান্স’ ক্যাটেগরি চালু করেছিল। এই পদক্ষেপটি আফ্রোবিটের উত্তরাধিকারী এবং আধুনিক আফ্রিকান পপ সাউন্ডের জনপ্রিয়তা, বিশেষ করে ‘আফ্রোবিটস’ ধারার উত্থানকে প্রতিফলিত করে।
এ বছরের গ্র্যামি অনুষ্ঠানে নাইজেরিয়ার আরেকজন সুপরিচিত শিল্পী বার্না বয় ‘বেস্ট গ্লোবাল মিউজিক অ্যালবাম’ ক্যাটেগরিতে নামান্বিত হয়েছেন, যা আফ্রিকান সঙ্গীতের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ধারাকে আরও দৃঢ় করে।
ফেলা কুটির পাশাপাশি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার পেয়েছেন মেক্সিকো-আমেরিকান গিটারবাদক কার্লোস সান্তানা, ফাঙ্কের রাণী চাকা খান এবং আমেরিকান গায়ক পল সাইমন। এই তালিকায় বিভিন্ন ধারার আইকন অন্তর্ভুক্ত, যা গ্র্যামি পুরস্কারের বৈচিত্র্যপূর্ণ স্বীকৃতির প্রতিফলন।
পুরস্কার গ্রহণের সময় ফেলা কুটির পরিবার, বন্ধু এবং সহকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন, যা তার সঙ্গীত ও সামাজিক আন্দোলনের প্রতি সম্মান ও স্মরণকে আরও দৃঢ় করে। উপস্থিতির মধ্যে ছিল তার সন্তান সেউন কুটি, নিকটস্থ সহকর্মী এবং দীর্ঘদিনের বন্ধু রিকি স্টেইন।
সেউন কুটি উল্লেখ করেন, “বিশ্বের মানবিক তন্তু এই স্বীকৃতির প্রয়োজন, শুধুমাত্র আমার পিতার জন্য নয়, বরং সারা মানবতার জন্য।” তিনি ফেলা কুটির সঙ্গীতের মানবিক সংযোগের শক্তি তুলে ধরেন।
রিকি স্টেইন ফেলা কুটির সামাজিক ন্যায়বিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “ফেলা কুটি কেবল সুরকারই ছিলেন না, তিনি সমাজের অবহেলিতদের কণ্ঠস্বর উঁচু করে তুলেছিলেন, সরকারী দুর্নীতি ও অবিচারকে তীব্রভাবে সমালোচনা করতেন।” তিনি যোগ করেন, “এই দিকটি উপেক্ষা করা সম্ভব নয়, কারণ তা ফেলা কুটির উত্তরাধিকারকে সম্পূর্ণভাবে গঠন করেছে।”
ফেলা কুটির কাজকে শুধুমাত্র সঙ্গীতের সীমা ছাড়িয়ে সাংস্কৃতিক তত্ত্ব, রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং সামাজিক পরিবর্তনের মঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার সৃষ্টিকর্মে আফ্রিকান পরিচয়, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের থিম স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, যা আজকের শিল্পী ও সক্রিয়তাবাদীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
গ্র্যামি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার ফেলা কুটির দীর্ঘায়িত প্রভাবকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুনরায় নিশ্চিত করেছে এবং আফ্রিকান সঙ্গীতের ভবিষ্যৎ পথকে উজ্জ্বল করেছে। এই স্বীকৃতি কেবল তার সঙ্গীতের গুণমানই নয়, তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতিও বহন করে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করবে।



