অস্থায়ী সরকার, যার মেয়াদ শেষের দিকে, দেশের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ও অবকাঠামো পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নিতে একাধিক উচ্চমূল্যের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তিগুলো নির্বাচিত সরকারের হাতে আর্থিক ও রাজনৈতিক দায়ভার চাপিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে, এবং ভোটের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি তীব্রতর হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের DP World কোম্পানি চট্টগ্রাম বন্দরস্থ নতুন মোরিং কন্টেইনার টার্মিনালের কার্গো পরিচালনা করার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই টার্মিনাল দেশের সবচেয়ে কৌশলগত বন্দর সম্পদ হিসেবে বিবেচিত, এবং DP World‑এর অংশগ্রহণ বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়াও, নভেম্বর মাসে ডেনমার্কের APM Terminals-কে ৩৩ বছরের জন্য লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার অধিকার প্রদান করা হয়। এই প্রকল্পের মোট মূল্য প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার, এবং দীর্ঘমেয়াদে বন্দর ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে।
সুইজারল্যান্ডের Medlog SA-কে পাঙ্গাওন রিভার পোর্টের ২২ বছরের চুক্তি প্রদান করা হয়েছে। এই চুক্তি উন্মুক্ত টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার নীতি অনুসরণ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
Medlog‑এর নির্বাচন উন্মুক্ত টেন্ডার ভিত্তিক হলেও, লালদিয়া ও DP World চুক্তিগুলোতে কোনো প্রতিযোগিতামূলক বিডের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার পার্থক্যই সরকারকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে, কারণ তা দীর্ঘমেয়াদী নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব নির্দেশ করে।
বিরোধীরা যুক্তি দেন যে, অস্থায়ী সরকার তার ক্ষমতার শূন্যতা ব্যবহার করে এমন চুক্তি সম্পন্ন করছে, যা নির্বাচিত সরকারের স্বায়ত্তশাসনকে সীমাবদ্ধ করবে। তারা বলেন, এই ধরনের অস্বচ্ছ সিদ্ধান্তগুলো দেশের ভবিষ্যৎ নীতি গঠনে অনিচ্ছাকৃত প্রভাব ফেলতে পারে।
বন্দর চুক্তির পাশাপাশি, সরকার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ১৪টি বয়িং বিমান ক্রয়ের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। এই ক্রয় পরিকল্পনা দেশের বিমান পরিবহন সক্ষমতা বাড়াবে বলে দাবি করা হলেও, আর্থিক দিক থেকে তা বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সরকার ১১৮জন সিনিয়র ব্যুরোকারের পদোন্নতি অনুমোদন করেছে এবং একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কমিশন পাবলিক সেক্টরের বেতন বৃদ্ধি ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবটি জনসাধারণের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, এত বড় বেতন বৃদ্ধি ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে থাকা সরকারি আর্থিক অবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে। তারা উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত ব্যয় এবং ঋণভার বাড়ার ফলে ভবিষ্যৎ বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে।
এই সব চুক্তি ও নীতি পরিবর্তন নির্বাচিত সরকারের হাতে আর্থিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বের বোঝা বাড়িয়ে দেবে, যদিও তারা এই সিদ্ধান্তগুলোতে কোনো ভূমিকা রাখেনি। ফলে নতুন সরকারকে এই চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা বা পুনরায় আলোচনার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
“It is, in principle, not morally correct,” Debapriya Bhattacharya বলেছেন, এবং তিনি এটিকে “মূলনীতির মৌলিক লঙ্ঘন” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, অস্থায়ী প্রশাসনের এই পদক্ষেপগুলো নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ।
ইলেকশন দিন ১২ ফেব্রুয়ারি নিকটবর্তী হওয়ায়, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা এই চুক্তিগুলোর ওপর তীব্র নজর রাখবে। নির্বাচিত সরকারকে হয়তো এই চুক্তিগুলো পুনরায় মূল্যায়ন করতে হবে, অথবা নতুন আর্থিক দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। ভবিষ্যতে এই চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন ও প্রভাব দেশের অর্থনৈতিক নীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে।



