নওগাঁ শহরের এটিএম মাঠে ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত জেলা বিএনপি জনসভায় চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। তিনি বললেন, বিএনপি কোনো হঠাৎ প্লেনে চড়ে পালানোর পরিকল্পনা করে না এবং জনগণের সঙ্গে থাকা কারণে ১৭ বছর অবধি কঠোর দমন সত্ত্বেও দলটি টিকে আছে। এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি দলের দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রামের মূল কারণকে ভোটারদের সমর্থন হিসেবে তুলে ধরেন।
তারেক রহমান উল্লেখ করেন, দেশের কিছু গোষ্ঠী ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশ ত্যাগ করেছে, তবে অন্য একটি গোষ্ঠী আছে যারা সর্বদা সঙ্গে থেকেছে। তিনি অতীতের রাজনৈতিক হেরফেরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, কিছু লোকের হাতে ভোটের বাক্সে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে এবং তা রোধের জন্য সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।
বক্তৃতায় তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় দেখা খালি বাক্সকে পূর্ণ বাক্সে রূপান্তর করার প্রচেষ্টা না করার আহ্বান জানান এবং ভোটের বাক্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর দাবি করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গত সতেরো বছর ধরে দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি, তাই এখনই গ্রামীণ নারী ও পুরুষের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকায় বড় বড় মেগা প্রকল্পের উন্নয়নকে তিনি স্বীকৃতি দিলেও, এসব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত দুর্নীতির মাত্রা বাড়ার কথা উল্লেখ করে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, উন্নয়ন কাজের সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হবে, নতুবা প্রকৃত উপকার গ্রামবাসীদের কাছে পৌঁছাবে না।
কৃষকদের প্রতি তারেকের মন্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; তিনি বললেন, কৃষক ভালো থাকলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। নওগাঁ অঞ্চলে ধান ও আমের উৎপাদন উভয়ই উচ্চমাত্রায় হয়, তবে আম সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় ক্ষতি হয়। এ সমস্যার সমাধানে তিনি হিমাগার স্থাপন ও রেলপথের উন্নয়নের মাধ্যমে পণ্যের সাশ্রয়ী পরিবহন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
শহীদ জিয়া পূর্বে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণের সুদ মওকুফ করেছিলেন, তা স্মরণ করে তিনি জানান, বিএনপি এখন দশ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ মওকুফের ব্যবস্থা করবে। পাশাপাশি, কৃষি কার্ডের ধাপে ধাপে বিতরণ করে বীজ ও সার সরবরাহ সহজতর করার প্রতিশ্রুতি দেন।
মহিলাদের কল্যাণে তিনি পরিবারিক কার্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ও মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয় হেলথকেয়ার সেন্টার চালু করার কথা উল্লেখ করা হয়।
শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য তিনি বললেন, সবাইকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে এমন নয়; খেলাধুলা ও তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিক যোগ হবে।
আইটি সেক্টরে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে, যা বাংলাদেশে কাজের সুযোগ বাড়াবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর সরাসরি কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি স্থানান্তর সম্ভব হবে।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে, আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলো পূর্বে বিএনপির এমন ঘোষণাকে রাজনৈতিক র্যালি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারী পক্ষ থেকে কোনো সরাসরি মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।
নির্বাচনের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের জনসভা ও ঘোষণার রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। বিএনপি এই বক্তৃতার মাধ্যমে গ্রামীণ ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ জোরদার করতে চায় এবং নির্বাচনী প্রচারণার নতুন দিক নির্ধারণের চেষ্টা করছে।
সারসংক্ষেপে, তারেক রহমানের বক্তব্যে দলীয় নীতি, কৃষি, নারী ও যুবক উন্নয়ন, আইটি বিনিয়োগ এবং ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট হয়েছে। আগামী নির্বাচনে এই পরিকল্পনাগুলি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং ভোটারদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।



