রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (IFFR) এর 55তম সংস্করণ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রটারডাম শহরের প্রধান হলের মঞ্চে উদ্বোধন করা হয়। উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নতুন চলচ্চিত্র “প্রভিডেন্স অ্যান্ড দ্য গিটার”-এর বিশ্বপ্রদর্শনী করা হয়, যা পর্তুগালের পরিচালক জোয়াও নিকোলাউ (টেকনোবস) রচিত একটি শিল্পীপ্রেমী কাজ। এই চলচ্চিত্রটি সৃজনশীলতা ও শিল্পের প্রতি সম্মান জানিয়ে তৈরি, এবং আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে প্রথমবারের মতো উপস্থাপিত হয়।
জোয়াও নিকোলাউ তার কাজের মাধ্যমে শিল্পীর সংগ্রাম ও সৃজনশীল আত্মার উজ্জ্বলতা তুলে ধরেছেন। তিনি বলছেন, আধুনিক সমাজে শিল্পের ভূমিকা প্রায়শই উপেক্ষিত হয়, তবে এই চলচ্চিত্রটি সেই অবহেলাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। চলচ্চিত্রের সঙ্গীত ও চিত্রনাট্য উভয়ই দর্শকের হৃদয়কে স্পর্শ করে, যা রটারডামের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করে।
উদ্বোধনী ভাষণে বিশ্বব্যাপী সংঘটিত সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করা হয়। বক্তারা ইরান, গাজা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে, যেখানে আইস (ICE) সংস্থার কার্যক্রম এবং নারীর অধিকারকে লক্ষ্য করে গ্লোবাল প্রতিক্রিয়া বাড়ছে। এই প্রসঙ্গে শিল্পের স্বাধীনতা রক্ষা করা কতটা জরুরি, তা পুনরায় জোর দেওয়া হয়।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নীতিমালা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে জোয়ান এফ. কেনেডি পারফরমিং আর্টস সেন্টারকে পুনঃনামকরণ করে ট্রাম্প-কেনেডি সেন্টার করা হয়েছে, যা শিল্পের স্বায়ত্তশাসনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই পরিবর্তনকে শিল্পের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে IFFR এর পরিচালক ভাঞ্জা কালুদজেরসিক এবং রটারডাম ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্লেয়ার স্টুয়ার্ট উপস্থিত ছিলেন। উভয়ই উৎসবের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য কাজ করছেন। তাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেছে এবং শিল্পের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য একসাথে দাঁড়ানোর সংকেত দিয়েছে।
ভাঞ্জা কালুদজেরসিকের স্বাগত বক্তব্যে মানবাধিকার, জীবন ও শিল্পের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তীব্র আহ্বান জানানো হয়। তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অশান্তি ও ক্ষমতার পরিবর্তন মানুষকে একাকিত্ব ও হতাশার দিকে ধাবিত করেছে। এমন সময়ে শিল্পের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কারণ এটি মানুষের মধ্যে সংহতি ও সমবেদনা জাগিয়ে তুলতে সক্ষম।
কালুদজেরসিকের মতে, সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, এটি একটি সমষ্টিগত দৃষ্টিকোণ প্রদান করে। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণ হয়, ভবিষ্যতের স্বপ্ন গড়ে ওঠে এবং সমাজের সাধারণ ভিত্তি পুনরায় নিশ্চিত হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিল্পের মাধ্যমে আমরা পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তুলতে পারি, যা বিভাজনের পরিবর্তে সংহতি তৈরি করে।
উক্তি হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জোয়ান এফ. কেনেডির একটি বক্তব্য উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি শিল্প ও সংস্কৃতির সমাজে ভূমিকা সম্পর্কে বলেছিলেন যে “দৈনন্দিন ঝড়ের পেছনে…”। যদিও পুরো উক্তি এখানে উল্লেখ করা হয়নি, তবে তার মূল বার্তা হল শিল্পের মাধ্যমে সমাজের অস্থিরতা মোকাবেলা করা সম্ভব।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি রটারডামের চলচ্চিত্রপ্রেমী ও শিল্পসচেতন দর্শকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের মঞ্চে নতুন কাজের প্রদর্শনী এবং শিল্পের স্বাধীনতার জন্য করা আহ্বান দুটোই একসাথে সমাজের পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
পাঠকগণকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, আসন্ন সপ্তাহে অনুষ্ঠিত IFFR এর বিভিন্ন প্রোগ্রাম অনুসরণ করে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত করুন এবং শিল্পের মাধ্যমে সামাজিক সংলাপের অংশ হন। শিল্পের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সমর্থনমূলক উদ্যোগে অংশগ্রহণ করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলবে।



