ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্যের দ্রুত প্রবাহের ফলে মিথ্যা খবরের বিস্তার বেড়েছে, যা স্বাস্থ্য, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এই প্রবণতা বিশেষ করে শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকা অঞ্চলে বেশি লক্ষ্যণীয়, যেখানে মানুষ প্রায়ই যাচাই না করা তথ্যের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়।
মানব ইতিহাসে যোগাযোগের পদ্ধতি গুহার চিত্র থেকে টেলিগ্রাফ, টেলিফোন ও টেলিভিশন পর্যন্ত ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। আজকের ডিজিটাল পরিবেশে এক ক্লিকেই তথ্য লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছায়, কিন্তু তথ্যের গতি ও মানুষের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির বিকাশ সমান গতিতে নয়।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অনেক ক্ষেত্রে মানবিক ও বৌদ্ধিক প্রস্তুতির চেয়ে দ্রুত এগিয়ে গেছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে, যেখানে শিক্ষার অবকাঠামো এখনও সম্পূর্ণ নয়, ডিজিটাল মিডিয়া দ্বিমুখী অস্ত্রের মতো কাজ করে। একদিকে এটি জ্ঞান ও তথ্যের দরজা খুলে দেয়, অন্যদিকে মিথ্যা, কল্পকাহিনি ও পরিকল্পিত প্রতারণার পথও তৈরি করে।
মিথ্যা তথ্যের প্রভাব শুধুমাত্র সামাজিক মিডিয়ার পোস্টে সীমাবদ্ধ নয়; এটি চিকিৎসা পরামর্শে ভুল নির্দেশনা, রাজনৈতিক প্রচারণায় বিভ্রান্তি এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, অনির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য তথ্যের ফলে রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে, আর ভুল রাজনৈতিক তথ্যের ফলে সামাজিক উত্তেজনা বাড়ে।
বৈশ্বিকভাবে দেখা যায়, শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা ও গণসচেতনতা সম্পন্ন দেশগুলোতে মিথ্যা তথ্যের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। সেখানে মানুষ তথ্যের উৎস যাচাই করে, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। তবে উন্নয়নশীল দেশে তথ্যের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন না করা সাধারণ, ফলে মিথ্যা তথ্য সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
বাংলা প্রবাদে বলা হয়, “মানুষ ঠেকিয়া শিখে”; তবে বর্তমান ডিজিটাল পরিবেশে এই প্রবাদটি বিপজ্জনক অর্থে রূপান্তরিত হয়েছে। একবার ভুল তথ্যের শিকার হলে তার পরিণতি গুরুতর হতে পারে, যেমন ভুল চিকিৎসা পরামর্শে প্রাণহানি বা মিথ্যা রাজনৈতিক প্রচারণায় সহিংসতা।
এই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব শুধুমাত্র ব্যবহারকারীর নয়, রাষ্ট্রেরও। সরকারকে তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করার জন্য নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে।
সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মালিকানাধীন কর্পোরেট সংস্থাগুলিও এই দায়িত্ব থেকে মুক্ত নয়। তাদের সেবা যেখানে মিথ্যা ও বিপজ্জনক তথ্য ছড়ায়, সেখানে তদারকি ও অপসারণের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব রয়েছে। প্ল্যাটফর্মগুলোকে স্বয়ংক্রিয় ফিল্টার, মানবিক পর্যালোচনা ও দ্রুত রিপোর্টিং সিস্টেমের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
প্রযুক্তি ক্ষেত্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলোও এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা তথ্যের গুণমান মূল্যায়ন, মিথ্যা তথ্যের সনাক্তকরণ অ্যালগরিদম উন্নয়ন এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য সুপারিশ প্রদান করে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মিথ্যা খবরের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণে অগ্রগতি অর্জন করেছে।
দীর্ঘমেয়াদে, মিথ্যা তথ্যের প্রভাব কমাতে প্রযুক্তি, শিক্ষা ও নীতির সমন্বয় প্রয়োজন। যদি ব্যবহারকারীরা তথ্যের উৎস যাচাই করতে শিখে, সরকার যথাযথ নিয়মাবলী প্রয়োগ করে এবং প্ল্যাটফর্মগুলো দ্রুত হস্তক্ষেপ করে, তবে ডিজিটাল যোগাযোগের সুবিধা নিরাপদে উপভোগ করা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, ডিজিটাল যুগে তথ্যের গতি বাড়লেও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া তত দ্রুত বিকশিত হয়নি। এই ফাঁক পূরণে রাষ্ট্র, কর্পোরেশন এবং নাগরিক সমাজের যৌথ প্রচেষ্টা দরকার, যাতে মিথ্যা তথ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সীমিত করা যায় এবং সত্যিকারের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা যায়।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তি ও নীতি উভয়েরই সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য, এবং তা না হলে মিথ্যা তথ্যের জাল আরও গভীর হয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ক্ষতি করবে।



