ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম গতকাল কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রংপুরের নির্বাচনি জনসভা ও পথসভায় ৫৪ বছর ধরে চালু থাকা ঐতিহ্যগত আইনকে জনগণ আর স্বীকার করতে চায় বলে মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর থেকে এই আইন ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, বিশাল অর্থ পাচার হয়েছে এবং দেশকে বিদেশি নির্ভরতায় ধাক্কা দেওয়া হয়েছে।
কুড়িগ্রামের উলিপুর, লালমনিরহাটের কেন্দ্রীয় বাজার ও রংপুরের একাধিক স্থানে একসঙ্গে অনুষ্ঠিত সভাগুলোতে রেজাউল করীমের বক্তব্য শোনা যায়। উপস্থিত ভক্ত ও অংশগ্রহণকারীরা তার কথা শোনার পর তালি দিলেন এবং তার দাবি সমর্থনে সাইন করলেন। তিনি বলেন, এই আইন আর দেশের উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং জনগণের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুন্ন করেছে।
বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামি সহ বর্তমান রাজনৈতিক জোটগুলোকে রেজাউল করীম ইসলামি আইন বাস্তবায়নে অপ্রতিবদ্ধ বলে সমালোচনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শুধুমাত্র ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশই রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় ইসলামী নীতি ও শারিয়াহ ভিত্তিক কাঠামো গড়ে তুলতে ইচ্ছুক। অন্য কোনো দল বা জোটের এই দৃষ্টিভঙ্গি নেই, এ কথায় তিনি দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তিনি সমর্থকদের হাতপাখা চিহ্নিত মার্কা দিয়ে ভোট দিতে আহ্বান জানান। রেজাউল করীমের মতে, হাতপাখা ইসলামের প্রতীক এবং এই চিহ্নের মাধ্যমে ভোট দিলে দেশের শাসনব্যবস্থা ইসলামী নীতি অনুসারে গড়ে উঠবে। তিনি এই আহ্বানকে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন।
ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা যদি নির্বাচনে জয়লাভ করে, তবে রেজাউল করীমের দাবি যে দুর্নীতি নির্মূল হবে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি সহ সব ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, তা বাস্তবায়িত হবে। তিনি অতিরিক্তভাবে উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকারী নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোকে রূপান্তরিত না করলে দেশের অগ্রগতি থেমে যাবে।
তবে রেজাউল করীম নির্বাচন প্রক্রিয়ার সমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এখনো নির্বাচনের মাঠ সম্পূর্ণভাবে সমতল হয়নি এবং কিছু এলাকায় অনিয়মের সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে, নতুবা ফলাফল বৈধতা হারাবে।
শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে জামায়াত-এ-ইসলামি এক নেতার হত্যাকাণ্ডের পর রেজাউল করীমের মন্তব্যও শোনা যায়। তিনি ঘটনাটিকে গভীর উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করে, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তোলেন। তুচ্ছ ঘটনার ভিত্তিতে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো অবহেলা থাকলে তা তদন্তের আওতায় আনা উচিত বলে তিনি জোর দেন।
রেজাউল করীমের এই বক্তব্যের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজের প্রতিনিধিরা মন্তব্য করেন। কিছু বিশ্লেষক বলেন, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের দাবি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনতে পারে, অন্যদিকে কিছু দল এই ধরনের ধর্মীয় ভিত্তিক আহ্বানকে সংবিধানিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বলে সমালোচনা করে।
অধিকন্তু, রেজাউল করীমের দাবি অনুযায়ী, যদি ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ সরকার গঠন করে, তবে দেশের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন বাড়বে এবং বিদেশি ঋণ ও নির্ভরতা কমবে। তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থনে দেশের বিভিন্ন শিল্প ও কৃষি খাতে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা উল্লেখ করেন।
জাতীয় নির্বাচনের দিন নিকটবর্তী হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো ঘনিষ্ঠভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। রেজাউল করীমের উক্তি ও আহ্বান দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং ভোটারদের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতীয় স্বার্থের সমন্বয় নিয়ে আলোচনা বাড়িয়ে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের কাজ হবে নিশ্চিত করা যে সব প্রার্থী সমান সুযোগ পাবে এবং ফলাফল স্বচ্ছভাবে প্রকাশ পাবে।



