ইসরায়েলি নাগরিক সাশা ট্রুফানোভ, ৩০ বছর বয়সী একজন আমাজন ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার, ৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে গাজা সীমান্তের কাছাকাছি কিবুত্স নীর ওজ-এ তার পরিবারকে দেখতে গিয়ে পালেস্টিনীয় ইসলামিক জিহাদ গুলিবিদ্ধদের হাতে বন্দি হন। একই সময়ে তার বাগদত্তা সাপির কোহেন, মা ও দাদি-ও গ্রেফতার হন, তবে নারীরা ৫০ দিনের বেশি সময়ের পরে মুক্তি পায়।
ট্রুফানোভকে ৪৯৮ দিন গাজা অঞ্চলের গুহা ও শিবিরে রাখা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও ইসরায়েলি সরকার বহুবার মুক্তির দাবি জানায়, তবে গুলিবিদ্ধরা শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে মুক্তি দেয়। তার মুক্তির পরপরই, শেষ বন্দী র্যান গভিলির দেহের পুনরুদ্ধার ঘটায়, যা সকল মুক্ত বন্দীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়।
লন্ডনে প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকারে ট্রুফানোভ গাজা থেকে ফিরে এসে জীবনের নতুন সূচনা সম্পর্কে তার অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, শেষ বন্দীর দেহের ফিরে আসা মানে “সব মুক্ত বন্দী এখন শ্বাস নিতে পারে এবং নিজেদের জীবন পুনর্নির্মাণের পথে এগিয়ে যেতে পারে”। এই মন্তব্যের সঙ্গে তিনি যুক্ত করেন, দীর্ঘ সময়ের মানসিক বোঝা অবশেষে হালকা হয়েছে।
মুক্তির পরেও ট্রুফানোভের মনে গাজা সম্পর্কিত একটি অদৃশ্য বন্ধন রয়ে যায়। তিনি বলেন, যদিও শারীরিকভাবে মুক্তি পেয়েছেন, গাজায় তার বন্ধুবান্ধব ও সহযোদ্ধারা এখনও বন্দিত্বে রয়েছে, ফলে তিনি সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেননি। এই অনুভূতি তাকে গাজার প্রতি দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সাক্ষাৎকারের দিনটি ট্রুফানোভের জন্য দ্বৈত অর্থবহ ছিল; একই দিনে তার পিতা ভিটালি ট্রুফানোভের জন্মদিন। পরে জানা যায়, পিতা ৭ অক্টোবরের একই দিনে গাজা হামলায় নিহত হয়েছিলেন, যা ট্রুফানোভের জন্য গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি প্রকাশ করেন, মুক্তির মুহূর্তে পিতার অনুপস্থিতি তার হৃদয়ে একটি শূন্যতা তৈরি করেছে।
আক্রমণের সময় কিবুত্স নীর ওজের বাড়িতে গুলিবিদ্ধরা প্রবেশ করে, কোহেন কম্বল দিয়ে নিজেকে ঢেকে বিছানার নিচে লুকিয়ে থাকলেও উভয়ই গ্রেফতার হন। ট্রুফানোভকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়; তাকে মুষ্টি মারার পাশাপাশি কাঁধে ছুরি ঢুকিয়ে আঘাত করা হয়। তিনি বর্ণনা করেন, আক্রমণকারীর মুখে তীব্র ক্রোধ ও ঘৃণার ছাপ স্পষ্ট ছিল, এবং ছুরি দিয়ে তাকে আরও আঘাত করার হুমকি দেওয়া হয়।
বন্দি হওয়ার পর ট্রুফানোভ কিছু সময়ের জন্য পালেস্টিনীয় গুলিবিদ্ধদের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তবে দৌড়ে গিয়ে দু’টি পায়ে গুলি হয়। তিনি জানান, গুলি হিটের তীব্র ব্যথা তার মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে, এবং এক গুলিবিদ্ধের রাইফেল দিয়ে মাথার পেছন থেকে আঘাত পেয়ে তার মাথা ফাটে যায়। এই আঘাতের ফলে তিনি দীর্ঘ সময় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া দ্রুত প্রকাশ পায়। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত গাজা অঞ্চলে মানবিক সহায়তা ও বন্দি মুক্তির প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, “বন্দি মুক্তি একটি মানবিক সাফল্য, যা শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য ইতিবাচক সংকেত দেয়”। একই সঙ্গে জাতিসংঘের গৃহস্থালি বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি উল্লেখ করেন, “সব বন্দীর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি মৌলিক অধিকার”।
এই ঘটনার পর গাজার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের গতিপথে নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচিত হয়। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরের আক্রমণ থেকে শুরু করে এই দীর্ঘকালীন বন্দিত্ব, অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও মানবিক পরিস্থিতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। পূর্বে ঘটিত হোস্টেজ সংকটের তুলনায়, এই মুক্তি প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজরে বেশি মনোযোগ পেয়েছে, যা ভবিষ্যৎ আলোচনায় নতুন শর্ত তৈরি করতে পারে।
ট্রুফানোভের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে তিনি জানান, শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ফিরে আসার পর তিনি আবার আমাজনে কাজ চালিয়ে যেতে চান এবং গাজার বন্ধুবান্ধবদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রকল্পে অংশ নিতে ইচ্ছুক। তার কথায় দেখা যায়, দীর্ঘ কারাবাসের পরেও তিনি নিজের পেশা ও মানবিক দায়িত্বকে পুনরায় গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
গাজা থেকে মুক্তি পাওয়া এই ইসরায়েলি ইঞ্জিনিয়ারের গল্প, আন্তর্জাতিক মানবিক নীতি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলাফলকে তুলে ধরে, একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ক্ষতি ও শোকের গভীরতা প্রকাশ করে। তার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ হোস্টেজ সংকটে কিভাবে মানবিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তা নিয়ে আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করবে।



