সাগরে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মি দ্বারা নিখোঁজ হওয়া ৪২০ জন জেলের মুক্তি চেয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবারগুলো ঢাকার এক শৈল্পিক অনুষ্ঠানে সরকারের কাছে আবেদন জানায়। গত পাঁচ মাসে টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিনের জলে আরাকান আর্মি কমপক্ষে চারশো বিশজন জেলেকে অপহরণ করেছে বলে পরিবারগুলো দাবি করে, আর সরকার থেকে কোনো ত্বরিত পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
বিকাল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরীর মিলনমঞ্চে “দ্বীপের নারীরা: সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জন্য একটি পরিবেশগত নারীবাদের দৃষ্টিভঙ্গি” শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনার আয়োজন সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স নামের একটি সংস্থা করেছে এবং এতে সেন্ট মার্টিন থেকে হুমায়রা বেগম ও রাবেয়া বেগম উপস্থিত ছিলেন। উভয়ই সেপ্টেম্বর মাসে তাদের স্বামীকে মাছ ধরতে গিয়ে আরাকান আর্মি অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে কোনো খবর পায়নি।
হুমায়রা বেগম কাঁধে কাঁধে দু’সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে গৃহস্থালির ঘাটতি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “স্বামীকে অপহরণ করার পর পাঁচ মাসে তার জীবিত থাকা-না থাকা জানি না, আর আমাদের সন্তানদের জন্য আধা পেটা খাবারই যথেষ্ট নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, “দাদনের ঋণ পরিশোধের চাপেও আছি, তাই স্বামীকে উদ্ধারের জন্য সরকারকে তৎপরতা দেখাতে অনুরোধ করছি।”
রাবেয়া বেগম স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে গৃহস্থালির কঠিন পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমাদের দেশের সীমানার মধ্যে মাছ ধরা এখন নিরাপদ নয়; আরাকান আর্মি নিয়মিত আমাদের জলসীমা থেকে জেলেদের নিয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তবে স্বামীকে মুক্তি পাওয়ার কোনো আশা নেই।” তার শাশুড়ি মদিনা বেগমও কণ্ঠ তুলেন, “আমাদের দু’সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আছে, স্বামীকে মুক্তি না পেলে আমাদের দুঃখ কখনো শেষ হবে না।”
সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা মো. যোবায়ের বলেন, “দুই মাসের জন্যই পর্যটন শুরু হয়েছে, তবে আমাদের মূল পেশা মৎস্য শিকারের ওপর নির্ভরশীল। আরাকান আর্মি আমাদের জেলেদের অপহরণ করে আমাদের জীবিকা ধ্বংস করছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “সরকার যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তবে আমাদের মাছ ধরার কাজই থেমে যাবে।”
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, “আর্কান আর্মি দ্বারা করা অপহরণ সংক্রান্ত তথ্য আমরা সংগ্রহ করছি এবং সংশ্লিষ্ট সীমানা অঞ্চলে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “বিধি অনুসারে অপহরণ একটি গুরুতর অপরাধ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বাংলাদেশের পুলিশ ও সীমানা রক্ষী বাহিনী ইতিমধ্যে টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিনের আশেপাশের জলে নজরদারি বাড়িয়ে দিয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, অপহরণকৃত জেলেদের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য স্যাটেলাইট চিত্র ও স্থানীয় তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বন্দীদের মুক্তির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালু করা হয়েছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, অপহরণ বাংলাদেশে অপরাধ কোডের ধারা ৩৯১ অনুসারে শাস্তিযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারে। এছাড়া, সীমানা রক্ষার দায়িত্বে থাকা সশস্ত্র বাহিনীর ওপরও দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে যে তারা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
পরিবারগুলো এখন সরকারকে ত্বরিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে, স্বামী-স্ত্রীর পুনর্মিলন ও সন্তানদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চায়। তারা আশা করে, সীমানা রক্ষার সংস্থা ও নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাজের মাধ্যমে অপহরণকৃত জেলেদের মুক্তি সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধ করা যাবে।



