সুনামগঞ্জের চাটাকুন্ডে ২০০৫ সালে ঘটিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের দু’টি মারাত্মক বিস্ফোরণের পর, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্র (ICSID) নিকো রিসোর্সকে বাংলাদেশকে মোট ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দিয়েছে। এই রায়ের ভিত্তি হল গ্যাসের ক্ষতি, পরিবেশগত প্রভাব এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি।
বিস্ফোরণগুলো ৭ জানুয়ারি এবং ২৪ জুন দুই দফায় ঘটেছিল, যার ফলে গ্যাসের সঞ্চয় পুড়ে গিয়ে প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস হারিয়ে যায়। নিকো রিসোর্সের বিরুদ্ধে এই ক্ষতির হিসাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ৪০ মিলিয়ন ডলার গ্যাসের ক্ষতির জন্য এবং অতিরিক্ত ২ মিলিয়ন ডলার পরিবেশ ও অন্যান্য ক্ষতির জন্য দাবি করেছে।
বাংলাদেশের দায়ের মোট পরিমাণে গ্যাস ক্ষতির জন্য ১১৮ মিলিয়ন ডলার এবং রাষ্ট্রের ক্ষতির জন্য ৮৯৬ মিলিয়ন ডলার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার সঙ্গে পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির হিসাব যোগ করা হয়েছিল। যদিও মূল দাবি এই পরিমাণের বেশি ছিল, তবে ট্রাইব্যুনাল শেষ পর্যন্ত ৪২ মিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেছে, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা সমান।
নিকো রিসোর্সের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা ২০০৭ সালে স্থানীয় নিম্ন আদালতে দায়ের হয়, যখন কোম্পানি টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস বিল পরিশোধ বন্ধ করে দেয়। সেই সময়ে নিকো ৭৪৬ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবির অস্বীকৃতি জানায়, ফলে পেট্রোবাংলা গ্যাসের বিল আটকে রাখে এবং নিকোর সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ আসে।
হাইকোর্ট নিকোর বাংলাদেশে থাকা সম্পদের উপর সম্পাদিত চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেয়, এরপর নিকো সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে, তবে সেখানেও বাংলাদেশী পক্ষের পক্ষে রায় দেয়া হয়। ২০১০ সালে নিকো আবার দুইটি মামলা নিয়ে ICSID-এ আবেদন করে, যার ফলস্বরূপ ২০১৪ সালে একটি রায়ে পেট্রোবাংলাকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের বকেয়া পরিশোধের নির্দেশ দেয়া হয়।
এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল শেষ পর্যন্ত নিকোকে ৪২ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের আদেশ দেয়। এই অর্থের বেশিরভাগ গ্যাস ক্ষতির ক্ষতিপূরণে যাবে, যা পেট্রোবাংলার আর্থিক ভার হ্রাসে সহায়তা করবে এবং গ্যাস ক্ষেত্রের পুনরুদ্ধার কাজের জন্য তহবিল সরবরাহ করবে।
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই রায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ঝুঁকি মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। নিকো রিসোর্সের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তি মেকানিজমের মাধ্যমে দায়বদ্ধ করা হলে, ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীরা চুক্তির শর্তাবলী ও পরিবেশগত দায়িত্বের প্রতি অধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে।
অন্যদিকে, পেট্রোবাংলার জন্য এই ক্ষতিপূরণ গ্যাস ক্ষেত্রের অবশিষ্ট মজুদ উত্তোলনের জন্য আর্থিক সহায়তা হিসেবে কাজ করবে। টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র ১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং পরের বছর কূপ খনন করে নয়টি গ্যাস স্তর চিহ্নিত করা হয়, যার মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর ১,০৯০ মিটার গভীরতায় অবস্থিত।
গ্যাসের পুনরুদ্ধার এবং বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত আয় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। তবে গ্যাস উত্তোলনের সময় পরিবেশগত সুরক্ষা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়েও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, কারণ পূর্বের বিস্ফোরণগুলো পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলেছিল।
আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘায়ু এবং উচ্চ আর্থিক দায়বদ্ধতা দেখিয়ে দেয় যে, জটিল প্রকল্পে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও চুক্তিগত শর্তাবলীর স্পষ্টতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে গ্যাস ও তেল ক্ষেত্রের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং পরিবেশগত সম্মতি নিশ্চিত করা বিনিয়োগের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে।
সংক্ষেপে, নিকো রিসোর্সের বিরুদ্ধে ৪২ মিলিয়ন ডলারের রায় পেট্রোবাংলার আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক সিগন্যাল এবং দেশের জ্বালানি সেক্টরের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বাড়াতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিবেশে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত দায়িত্বের গুরুত্ব পুনরায় জোরদার করেছে।



