১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে, নিউইয়র্ক ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) দেশীয় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য লিখিত আহ্বান জানিয়েছে। সিপিজে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত চিঠিতে উল্লেখ করেছে যে, আসন্ন ভোটের সময় মিডিয়ার ওপর হিংসা, ভয় দেখানো এবং অপরাধ বা জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি প্রত্যেক দলকে নিতে হবে। এছাড়া নির্বাচনের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্যও তাগিদ জানানো হয়েছে।
সিপিজে যে দলগুলোকে চিঠি পাঠিয়েছে সেগুলো হল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক দল এবং জাতীয় পার্টি। চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই দলগুলোকে জনসমক্ষে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং কোনো ধরনের সহিংসতা, ভয় দেখানো বা আইনের দুষ্প্রয়োগের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ করতে হবে। সিপিজে জোর দিয়ে বলেছে, নির্বাচনের পরেও এই নীতিগুলো রক্ষা করা হবে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
সিপিজের গবেষণা অনুযায়ী, নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে যে, মিডিয়ার ওপর সরাসরি হামলা, হুমকি, রাজনৈতিক মেরুকরণভিত্তিক হয়রানি এবং পাঁচজন সাংবাদিকের কারাবরণ ঘটেছে, যাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পেছনে তাদের সাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক সংযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই ঘটনা মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে এবং সিপিজে এই প্রবণতা থামাতে তৎপরতা দাবি করেছে।
গত ডিসেম্বরের ঘটনা বিশেষভাবে নজরে এসেছে। দেশের দুইটি বৃহত্তম দৈনিক, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার, ‘মব’ আক্রমণের শিকার হয় এবং এক সংবাদকেন্দ্র জ্বলন্ত ভবনে আটকে পড়ে। এই হামলা মিডিয়া কর্মীদের শারীরিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলে এবং নির্বাচনী সময়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মুখে রয়েছে তা স্পষ্ট করে। সিপিজে উল্লেখ করেছে, এমন আক্রমণগুলো শুধুমাত্র শারীরিক ক্ষতি নয়, সাংবাদিকদের কাজের স্বাধীনতাকে দমন করার উদ্দেশ্য বহন করে।
ডিজিটাল ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি তীব্র। প্রতিবেদক, সম্পাদক ও মন্তব্যকারীরা অনলাইন হুমকি, নির্দিষ্ট আদর্শের হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সমন্বিত বিদ্বেষমূলক প্রচারণার শিকার হচ্ছেন। সামাজিক মিডিয়ায় লক্ষ্যভিত্তিক ট্রোলিং, মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তাদের সুনাম নষ্ট করার প্রচেষ্টা বাড়ছে। সিপিজে এই ধরনের ডিজিটাল হয়রানিকে মিডিয়া স্বাধীনতার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যম সংস্কার এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে সাংবাদিকদের ওপর হুমকি ও দমনমূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। সিপিজে উল্লেখ করেছে, যদিও কিছু নীতি ঘোষিত হয়েছে, বাস্তবায়নে যথেষ্ট অগ্রগতি দেখা যায়নি এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন।
সিপিজে ভবিষ্যতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য মিডিয়া স্বাধীনতা অপরিহার্য বলে পুনরায় জোর দিয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বাচনের সময় ও পরে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবে। যদি দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি না মানে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে চাপ বাড়তে পারে এবং দেশের গণতান্ত্রিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, সিপিজের চিঠি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে: স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সুরক্ষা না হলে, নির্বাচনের ফলাফল ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে। তাই, নির্বাচনের আগে এবং পরে উভয় সময়ে মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।



