রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সাম্প্রতিক দেহ বিনিময়ের মাধ্যমে রাশিয়া ১,০০০ ইউক্রেনীয় সৈন্যের দেহ গ্রহণ করেছে, আর ইউক্রেন রাশিয়ার পক্ষ থেকে ৩৮টি দেহ পেয়েছে। এই বিনিময়টি দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, মানবিক দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিনিময়টি ২০২৫ সালে ইস্তাম্বুলে আলোচিত চুক্তির অংশ, যেখানে উভয় পক্ষ ১২,০০০ দেহের পাশাপাশি ২৫ বছরের নিচের বয়সের রোগী ও গুরুতর আহত বন্দীর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করেছে। চুক্তিতে দেহের পাশাপাশি রোগী ও আঘাতপ্রাপ্ত বন্দীর পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রাশিয়ার প্রধান আলোচক ভ্লাদিমির মেদিনস্কি টেলিগ্রামে একটি ছবি শেয়ার করে দেখিয়েছেন, যেখানে বায়ো-হ্যাজার্ড স্যুট পরা কর্মীরা সাদা রেফ্রিজারেটেড ট্রাকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাকগুলো দেহের নিরাপদ পরিবহনের জন্য বিশেষভাবে সজ্জিত, এবং ছবিতে দেখা যায় কর্মীরা সতর্কতার সাথে দেহগুলো লোড ও আনলোড করছেন।
এই বিনিময়টি নভেম্বর ২০২৪-এ শেষ হওয়া দেহ বিনিময়ের ধারাবাহিকতা, যখন রাশিয়া ১,০০০ দেহ ইউক্রেনকে ফেরত দিয়েছিল এবং ৩০টি দেহ গ্রহণ করেছিল। সেই সময়ে উভয় পক্ষের মধ্যে দেহের দ্রুত হস্তান্তর নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ লজিস্টিক ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল।
অক্টোবর ২০২৫ থেকে কোনো বন্দী বিনিময় হয়নি; উভয় পক্ষ একে অপরকে দেরি করার অভিযোগে অভিযুক্ত করছে। রাশিয়া দাবি করে যে ইউক্রেন দেহের পাশাপাশি বন্দীর প্রত্যাবর্তনে বাধা দিচ্ছে, আর ইউক্রেন রাশিয়ার দেরি ও শর্তের পরিবর্তনের অভিযোগ তুলে।
ফেব্রুয়ারি ২০২২-এ রাশিয়ার পূর্ণমাপের আক্রমণের চতুর্থ বার্ষিকী নিকটে আসার সঙ্গে সঙ্গে শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টা তীব্র হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়ার ফলে দু’দেশই কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় করে চলেছে, যদিও বাস্তবিক সংঘাতের তীব্রতা কমেনি।
সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ত্রিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন, যা যুদ্ধের শুরু থেকে প্রথমবারের মতো। বৈঠকে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, মানবিক সহায়তা এবং বন্দী ও দেহের পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সব পক্ষই বৈঠককে গঠনমূলক বলে উল্লেখ করেছে, তবে ডোনেটস্কের ২৫% অঞ্চল নিয়ে রাশিয়ার দাবি এখনও সমাধানহীন রয়ে গেছে। রাশিয়া দাবি করে যে ডোনেটস্কের এই অংশের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি সম্ভব নয়, আর ইউক্রেন এই শর্তকে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করছে।
কূটনৈতিক অগ্রগতির মাঝেও উভয় পক্ষের ড্রোন আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে; মঙ্গলবার খারকিভ অঞ্চলে রাশিয়ার ড্রোন একটি যাত্রী ট্রেনকে আঘাত করে কমপক্ষে পাঁচজনের মৃত্যু ঘটেছে। এই আক্রমণটি স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থাকে বিশৃঙ্খলায় ফেলে এবং বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাশিয়া সাম্প্রতিক মাসে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আক্রমণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে শীতল তাপমাত্রায় বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস পাইপলাইন এবং হিটিং সিস্টেমের লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় বহু পরিবার শীতের তীব্রতায় তাপের অভাবে ভুগছে।
একজন বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, দেহ বিনিময় মানবিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, যুদ্ধের তীব্রতা কমাতে তা যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, দেহের প্রত্যাবর্তন পরিবারকে কিছুটা সান্ত্বনা দেবে, তবে বাস্তবিক যুদ্ধের মূল কারণ ও কৌশলগত লক্ষ্যগুলো সমাধান না করা পর্যন্ত শান্তি অর্জন কঠিন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতার জন্য আরও নির্দিষ্ট শর্তাবলী ও ত্রিপাক্ষিক তত্ত্বাবধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন। তারা জোর দিয়ে বলছেন যে দেহ ও বন্দীর পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার পাশাপাশি, মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন কাজের জন্য স্বতন্ত্র তত্ত্বাবধানকারী সংস্থার অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে ২০২৬ সালের বসন্তে সম্ভাব্য শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যেখানে বন্দী ও দেহের সম্পূর্ণ প্রত্যাবর্তন এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিষয় আলোচনা হবে। বিশ্লেষকরা আশা করছেন যে এই শীর্ষ বৈঠকে ত্রিপাক্ষিক তত্ত্বাবধানের কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে এবং ডোনেটস্কের অবশিষ্ট অঞ্চল নিয়ে সমঝোতা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে।



