অন্তর্বর্তী বাংলাদেশ সরকার কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি রোধে নতুন অধ্যাদেশের খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। অনুমোদনটি বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নেওয়া হয়। খসড়া শারীরিক, মৌখিক, ইঙ্গিতপূর্ণ এবং ডিজিটাল সব ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণকে যৌন হয়রানি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।
বৈঠকটি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ একাধিক নীতি বিষয় আলোচনা করা হয়। কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের খসড়া, ২৩ মার্চকে বিএনসিসি দিবস হিসেবে পালন, গায়ানায় বাংলাদেশের মিশন স্থাপনসহ মোট এগারোটি বিষয় সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
বৈঠকের পর বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, উপ‑প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ এবং সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেন। তারা বৈঠকের মূল সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য নীতিগত পদক্ষেপের সংক্ষিপ্তসার উপস্থাপন করেন।
প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে যৌন হয়রানির সংজ্ঞা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। শারীরিক স্পর্শ, মৌখিক মন্তব্য, অমৌখিক ইঙ্গিত এবং ই‑মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনলাইন আচরণকে সকলকে যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য করা হবে।
ডিজিটাল পরিবেশে সংঘটিত হয়রানিকেও একই আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে, ফলে ই‑মেইল, চ্যাট, ভিডিও কল ইত্যাদি মাধ্যমে করা অপমানজনক বা অশ্লীল বার্তাকে শাস্তিযোগ্য করা হবে। এই পদক্ষেপটি আধুনিক কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা বিবেচনা করে নেওয়া হয়েছে।
অধিকাংশ শাস্তি তিরস্কার থেকে শুরু করে পদাবনতি, চাকরিচ্যুতি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কারের পর্যন্ত বিস্তৃত। শাস্তির মাত্রা ঘটনার তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তির ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হবে।
অধ্যাদেশে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এই কমিটি গঠন করে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও শাস্তি সুপারিশের দায়িত্ব নিতে হবে।
কমিটি অভিযোগের গোপনীয়তা রক্ষা, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং তদন্তের সময়সীমা ৯০ দিন নির্ধারণ করেছে। তদন্তের সময় সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুনরায় ক্ষতি না হওয়ার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অধিকন্তু, অভিযোগের ফলে কোনো প্রতিশোধমূলক কাজ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিশোধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিধানও অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা অভিযোগকারীর আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।
এই নীতিগত অনুমোদনের পর পরবর্তী ধাপে খসড়া আইনসভায় উপস্থাপন করা হবে এবং সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি এখন থেকে কমিটি গঠন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই ব্যাপক সংজ্ঞা ও কঠোর শাস্তি ব্যবস্থা কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। তবে বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ তদারকি ও সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষকও এই পদক্ষেপকে সরকারী নীতি হিসেবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন, কারণ এটি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য মোকাবেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো প্রদান করবে। ভবিষ্যতে এই অধ্যাদেশের কার্যকারিতা ও প্রয়োগের ফলাফল দেশের সামগ্রিক লিঙ্গ সমতা নীতিতে প্রভাব ফেলবে।



