রাজশাহীর হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বৃহস্পতিবার বিকেল ২টা ৩০ মিনিটে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজশাহীর যুবকদের জন্য আইটি পার্ক চালু করে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি একই সময়ে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ, বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন প্রকল্প (BMDA) পুনরুজ্জীবন এবং কৃষকদের জন্য সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
জনসভায় উপস্থিত ভক্ত ও সমর্থকরা তারেকের বক্তব্য শোনার জন্য একত্রিত হয়। তিনি মঞ্চে উঠে প্রথমে উল্লেখ করেন, তিনি অন্য দলের সমালোচনা করতে আসেননি, বরং জনগণের স্বার্থে কথা বলতে চান। “অন্যের সমালোচনা করে কি জনগণের লাভ হবে? হবে না,” তিনি বলেন, যা তার বক্তৃতার মূল সুরকে নির্ধারণ করে।
তারেক ২২ বছর পর রাজশাহীর মানুষের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করার কথা স্মরণ করে বলেন, তার এই অঞ্চলের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। উপস্থিত নেতারা ও সমর্থকরা তার এই মন্তব্যের পর করতালি দিয়ে স্বাগত জানায়।
বক্তব্যের মাঝামাঝি তিনি পদ্মা নদীর গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, নদী থাকলেই যথেষ্ট নয়, নদীতে পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। “নদী না থাকলে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়,” তিনি বলেন, যা স্থানীয় কৃষকদের উদ্বেগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাজশাহীকে শিক্ষা নগরী হিসেবে পরিচিতি দেওয়া হলেও, তারেক জানান, এখানে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য যথেষ্ট কর্মসংস্থান নেই। তিনি উল্লেখ করেন, শহরে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তবে স্নাতকোত্তর শেষ করার পর চাকরির সুযোগ সীমিত। এই ফাঁক পূরণে আইটি পার্ক ও আইটি ভিলেজের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আইটি পার্কের কার্যকরী অবস্থার কথা বলার সময় তিনি বলেন, বর্তমানে পার্কটি চালু আছে, তবে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগের অভাবে তা সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য হয়নি। তিনি স্থানীয় যুবকদের জন্য প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BMDA) সম্পর্কে তিনি জানিয়ে দেন, পূর্বে এই সংস্থা ফসলের উৎপাদন দ্বিগুণ করতে সহায়তা করেছিল, তবে বর্তমানে কার্যক্রম বন্ধের পথে। তিনি সংস্থাটিকে পুনরায় চালু করে কৃষি ও শিল্প উভয় ক্ষেত্রেই উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্য রাখছেন।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের ক্ষেত্রে তারেক জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষে জয় হলে ব্যারেজ নির্মাণে হাত দিতে ইচ্ছুক। তিনি ব্যারেজের মাধ্যমে নদীর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং সেচের সুবিধা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করেন, যা কৃষকদের আয় বাড়াতে সহায়ক হবে।
আইটি ভিলেজে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলছেন, আইটি ভিলেজে নতুন কোম্পানি ও স্টার্টআপের জন্য অবকাঠামো তৈরি করে স্থানীয় যুবকদের জন্য সরাসরি চাকরির সুযোগ তৈরি করা হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তি-ভিত্তিক শিল্পের বিকাশে ত্বরান্বিত করা হবে।
কৃষকদের আর্থিক বোঝা কমাতে তিনি সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এই মওকুফের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতারা অতিরিক্ত সুদ থেকে মুক্ত হয়ে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হবেন, যা সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জনসভার সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ, আর সাধারণ সম্পাদক মাফজুর রহমান সঞ্চালনা করেন। সকাল ১০টা থেকে স্থানীয় নেতারা মঞ্চে বক্তব্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন, এবং বিকেল ১২টা ২০ মিনিটে তারেককে বহনকারী উড়োজাহাজ রাজশাহী হযরত শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দর থেকে প্রায় এক ঘন্টা পরে তিনি শাহ মখদুমের দরগা শরিফে গিয়ে ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দুপুর ২টার দিকে তিনি ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান হিসেবে পরিচিত স্থানটি, হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে পৌঁছান, যেখানে তিনি নির্বাচনী জনসভা পরিচালনা করেন।
এই জনসভা রাজশাহীর রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করার পাশাপাশি, স্থানীয় উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত স্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তারেকের ঘোষণাগুলি ভবিষ্যতে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যুব ভোটার ও কৃষকদের সমর্থন অর্জনে।



