চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে করা চুক্তির বৈধতা সম্পর্কে উচ্চ আদালত আজ (২৯ জানুয়ারি) একক বেঞ্চে রুল খারিজ করে চূড়ান্ত রায় প্রদান করেছে। ফলে চুক্তি আর কোনো আইনি বাধা ছাড়াই কার্যকর হতে পারে এবং বিদেশি অপারেটরকে টার্মিনাল পরিচালনার অনুমতি নিশ্চিত হয়েছে।
এনসিটি হল চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার একটি আধুনিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধা, যার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির অধীনে অপারেটরকে টার্মিনালের দৈনন্দিন কার্যক্রম, মেরামত ও উন্নয়ন পরিকল্পনা পরিচালনা করার অনুমোদন দেওয়া হবে।
উচ্চ আদালতে রুল খারিজের রায় একক বেঞ্চে বিচারপতি জাফর আহমেদের দ্বারা দেওয়া হয়। রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চুক্তির বৈধতা নিয়ে কোনো আইনি আপত্তি নেই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে চুক্তি কার্যকর করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। রায়ের ফলে চুক্তি আর কোনো বিচারিক বাধা ছাড়াই বাস্তবায়িত হতে পারে।
বিচারকেন্দ্রে রিটের পক্ষে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক প্রতিনিধিত্ব করেন। উভয় পক্ষের যুক্তি শোনার পর রায় প্রদান করা হয়।
এই রায়ের পূর্বে ৪ ডিসেম্বর উচ্চ আদালতে একটি দ্বিধাবিভক্ত রায় প্রকাশিত হয়। জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফাতেমা নজিব চুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করেন, যেখানে জুনিয়র বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রিট চুক্তিকে বৈধ বলে মত দেন। দুই বিচারকের ভিন্নমত উচ্চ আদালতের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছিল।
বিচারিক বিভাজন সমাধানের জন্য প্রধান বিচারপতি মামলাটি একক বেঞ্চে পাঠান এবং বিচারপতি জাফর আহমেদের কাছে রায়ের দায়িত্ব অর্পণ করেন। এরপর রিটের পক্ষে ও রাষ্ট্রপক্ষে উভয় পক্ষের আইনজীবী উপস্থিত হয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন।
মামলার শোনানি ২৫ নভেম্বর শেষ হয় এবং একই দিনে রায়ের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়। শোনানির পর আদালত রায়ের খসড়া প্রস্তুত করে এবং রায়ের প্রকাশের তারিখ নির্ধারণ করে। এই প্রক্রিয়া রিটের পক্ষে ও রাষ্ট্রপক্ষে উভয় পক্ষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে।
৩০ জুলাই উচ্চ আদালত রিটের পক্ষে একটি রুল জারি করে, যেখানে চুক্তি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং অপারেটর নিয়োগের আগে ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক পাবলিক বিডিং নিশ্চিত করা হবে কিনা তা স্পষ্ট করতে চায়। রুলে আদালত অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখার নির্দেশনা দেয়।
বিবাদী রিটটি বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসেনের দায়িত্বে দায়ের করা হয়। রিটে নৌসচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিরোধী পক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
উচ্চ আদালতের রায়ের ফলে বিদেশি কোম্পানির টার্মিনাল পরিচালনার অনুমোদন নিশ্চিত হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর অঞ্চলে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে বলে আশা করা যায়। আন্তর্জাতিক অপারেটরদের অংশগ্রহণ টার্মিনালের প্রযুক্তিগত মানোন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সেবা গুণগত মান উন্নত করতে সহায়তা করবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এনসিটি-তে কার্যকরী পরিচালনা পোর্টের গড় টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমাবে, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বাড়াবে এবং অতিরিক্ত শিপিং লাইনকে আকৃষ্ট করবে। ফলে বন্দর টার্মিনালের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের রপ্তানি-আমদানি প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে রায়ের পরেও কিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে। চুক্তি বাস্তবায়নের সময় নীতি-নিয়মের সঠিক অনুসরণ, পাবলিক বিডিং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং অপারেটরের আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে ভবিষ্যতে আইনি বিরোধ বা আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, উচ্চ আদালতের রায় এনসিটি চুক্তিকে বৈধ ঘোষণা করে চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেয়। এটি বন্দর অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, পোর্টের প্রতিযোগিতামূলকতা বৃদ্ধি এবং দেশের বাণিজ্যিক প্রবাহে ইতিবাচক অবদান রাখার সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে চুক্তি বাস্তবায়নের সময় স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করা হবে এমন শর্তে এই সম্ভাবনা পূর্ণতা পাবে।



