ডাচ চলচ্চিত্র নির্মাতা টম ফাসার্টের নতুন ডকুমেন্টারি ‘বিটুইন ব্রাদার্স’ (Tussen broers) ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব রটারড্যাম (IFFR) এর ৫৫তম সংস্করণের লিমলাইন প্রোগ্রামে বিশ্বপ্রদর্শনী পেয়েছে। চলচ্চিত্রটি রটারড্যাম শহরে অনুষ্ঠিত এই মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে প্রথমবারের মতো দর্শকের সামনে উপস্থাপিত হয়। এতে ফাসার্টের নিজের পরিবারে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত দুই বৃদ্ধ ভাই—বাবা রব (৭২) এবং তার বড় ভাই রেনে (৭৫)—এর সম্পর্ক ও অতীতের গোপন রহস্য উন্মোচিত হয়।
টম ফাসার্ট ডাচ ডকুমেন্টারি জগতের পরিচিত নাম, যিনি পারিবারিক বিষয় ও পরিচয়ের গভীর অনুসন্ধানের জন্য স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তার পূর্বের কাজগুলোতে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সামাজিক কাঠামোর সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে, আর ‘বিটুইন ব্রাদার্স’ এ তিনি নিজের পারিবারিক ইতিহাসকে কেন্দ্র করে একটি নতুন গল্প গড়ে তুলেছেন। এই প্রকল্পে তিনি নিজের পিতার সঙ্গে তার ভাইয়ের সম্পর্ককে ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করে দর্শকদেরকে এক অনন্য যাত্রায় নিয়ে যান।
চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র রব, একসময় মনোবিজ্ঞানী, এবং রেনে, যিনি মানসিক রোগে আক্রান্ত এবং একাকীভাবে বসবাসকারী হোর্ডার, তাদের দৈনন্দিন মিথস্ক্রিয়া দিয়ে গল্পের সূচনা হয়। রব নিয়মিত রেনে’র বাড়িতে গিয়ে তার জিনিসপত্র সরিয়ে দিতে সাহায্য করেন, যা দুজনের মধ্যে হাস্যরস ও দুঃখের মিশ্রণ তৈরি করে। এই অংশটি প্রায়শই ট্র্যাজিকোমেডি স্বরূপে উপস্থাপিত হয়, যেখানে ভাইয়ের অস্বাভাবিক আচরণ ও পিতার যত্নের মিশ্রণ দেখা যায়।
চলচ্চিত্রের বর্ণনা ধীরে ধীরে একটি রোড ট্রিপে রূপান্তরিত হয়, যেখানে দুই ভাই তাদের অজানা পিতার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। পিতার নাম ও পরিচয় দীর্ঘদিনের অন্ধকারে ঢাকা ছিল; তিনি দুজনকে শৈশবে একটি শিশুকেন্দ্রিক আশ্রয়ে রেখে গিয়ে আর কখনো ফিরে আসেননি। এই অনুপস্থিত পিতার সন্ধানই চলচ্চিত্রের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, যা দর্শকদেরকে অতীতের ধোঁয়াটে স্মৃতির পথে নিয়ে যায়।
বছরের পর বছর, রব ও রেনে দুজনের মা মারা যাওয়ার পর, দুই ভাই শেষবারের মতো তাদের অতীতের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করার প্রচেষ্টা করে। এই মুহূর্তে তারা একে অপরের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করে এবং অতীতের ব্যথা মোকাবিলার জন্য একসাথে কাজ করে। চলচ্চিত্রের লোগলাইন অনুযায়ী, এই দুই বৃদ্ধ ভাই তাদের জীবনের শেষ পর্যায়ে একে অপরের সঙ্গে মিলে অতীতের গাঁথা সমাধান করার চেষ্টা করে।
ফাসার্টের কাজের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: পারিবারিক ট্রমার চক্র কি ভাঙা সম্ভব? তিনি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিজেকে এবং দর্শকদেরকে এক জটিল আবেগের পথে নিয়ে যান। চলচ্চিত্রে দেখা যায় কিভাবে পুরনো ক্ষতি, স্মৃতি এবং পরিচয় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায় এবং নতুন প্রজন্মের জন্য কী ধরনের প্রভাব ফেলে।
‘বিটুইন ব্রাদার্স’ কেবল একটি পারিবারিক ডকুমেন্টারি নয়, এটি একটি সামাজিক মন্তব্যও বহন করে। এতে দেখানো হয়েছে কিভাবে মানসিক রোগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পারিবারিক অবহেলা একত্রে একটি জটিল মানবিক চিত্র গড়ে তোলে। ফাসার্টের ক্যামেরা এই বিষয়গুলোকে সূক্ষ্মভাবে ধরেছে, যাতে দর্শকরা প্রতিটি দৃশ্যে মানবিক দিকের গভীরতা অনুভব করতে পারেন।
চলচ্চিত্রের কাঠামো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়; প্রথমে হাস্যকর মুহূর্তগুলোতে মনোযোগ দেয়া হয়, পরে গম্ভীর অনুসন্ধান ও আত্মবিশ্লেষণে পরিণত হয়। এই পরিবর্তন দর্শকদেরকে আবেগের বিভিন্ন স্তরে নিয়ে যায়, যেখানে হাসি, কান্না, রাগ ও স্বস্তি একসাথে মিশে থাকে। ফাসার্টের নিজস্ব উপস্থিতি ও মন্তব্য চলচ্চিত্রকে ব্যক্তিগত স্তরে আরও সংযুক্ত করে, যা দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে।
উৎসবের লিমলাইন প্রোগ্রামটি সাধারণত এমন কাজগুলোকে সমর্থন করে, যেগুলো শিল্পের সীমানা ছাড়িয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। ‘বিটুইন ব্রাদার্স’ এই মানদণ্ডে পুরোপুরি মানানসই, কারণ এটি পারিবারিক গোপনীয়তা, স্মৃতি ও পরিচয়ের জটিলতা তুলে ধরে। রটারড্যামের আন্তর্জাতিক দর্শকরা এই কাজকে উচ্চ প্রশংসা দিয়ে স্বাগত জানিয়েছে এবং ফাসার্টের কাজের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে।
চলচ্চিত্রের সমাপ্তি অংশে ফাসার্ট দর্শকদেরকে একটি চিন্তাশীল প্রশ্ন রেখে যান: অতীতের ক্ষতিগুলো কি সত্যিই মিটিয়ে ফেলা যায়, নাকি সেগুলোকে স্বীকার করে নতুন জীবনের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নটি চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পায়, যেখানে দুই ভাই একসাথে একটি পুরনো রাস্তার দিকে হাঁটছে, যা তাদের অতীতের পথে ফিরে যাওয়ার প্রতীক।
‘বিটুইন ব্রাদার্স’ রটারড্যামের মঞ্চে উপস্থাপিত হওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ফাসার্টের ব্যক্তিগত অনুসন্ধান ও পারিবারিক ইতিহাসের মিশ্রণ একটি অনন্য ডকুমেন্টারি রূপে রূপান্তরিত হয়েছে, যা দর্শকদেরকে আত্মবিশ্লেষণ ও মানবিক সংযোগের নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করে। এই কাজটি ভবিষ্যতে পারিবারিক ডকুমেন্টারির মানদণ্ডকে পুনর্নির্ধারণের সম্ভাবনা রাখে।



