বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মনসুরের আজকের প্রেস কনফারেন্সে জানানো হয়েছে যে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জমাকারীরা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তাদের জমার ওপর লাভ তুলে নিতে পারবেন। এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হল ব্যাংকের আর্থিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় জমাকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা।
গভর্নর উল্লেখ করেছেন যে, সব জমাকারীর মূলধন সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত থাকবে এবং পূর্বে ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ধীরে ধীরে ফেরত দেওয়া হবে। বর্তমানে কোনো একক জমা স্কিম থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা সম্ভব, যা নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন স্তরে অসন্তোষের স্রোত দেখা গিয়েছে, তবে সরকার ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মনসুর বলেন, কোনো পরিকল্পনা একবারে শত শতাংশ সফলতা অর্জন করতে পারে না; সমস্যাগুলো সময়ের সঙ্গে সনাক্ত করে ধাপে ধাপে সমাধান করা হয়।
এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, কিছু গোষ্ঠী ব্যাংকের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে, যা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার গতি ধীর করে দিতে পারে। তবে সরকার এই বাধাগুলো দূর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
১ জানুয়ারি থেকে জমাকারীরা বাজারের prevailing হার অনুযায়ী লাভ পেতে শুরু করেছেন। এক বছরের বেশি মেয়াদী জমার জন্য লাভের হার ৯.৫ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে, আর এক বছরের কম মেয়াদী জমার জন্য তা ৯ শতাংশ রাখা হয়েছে। এই হারগুলো বর্তমান আর্থিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত।
গভর্নর জোর দিয়ে বলেছেন যে, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় জমাকারীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সরকার দুই বছর পর্যন্ত ৪ শতাংশ অতিরিক্ত সমর্থন প্রদান করবে, যার মোট ব্যয় প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা হিসেবে অনুমান করা হয়েছে। এই সহায়তা ব্যাংকের আর্থিক ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্সুর জমাকারীদের শান্ত থাকতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ব্যাংক সংক্রান্ত গুজব ও অশান্তি থেকে দূরে থাকা উচিত। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, কোনো ভুয়া তথ্য বা অপ্রয়োজনীয় অশান্তি ব্যাংকের পুনর্গঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এই ঘোষণার পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনা, যেখানে একত্রিত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক (এক্সইম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী)কে ২০২৪ ও ২০২৫ ক্যালেন্ডার বছরের জন্য লাভ প্রদান না করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
যদিও এই নির্দেশনা জমাকারীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তবুও সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ৪ শতাংশ অতিরিক্ত সমর্থন প্রদান করে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দুই বছর ধরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে আর্থিক সুরক্ষা প্রদান করা হবে।
গভর্নর আরও উল্লেখ করেন, এই সমর্থন ব্যবস্থা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং জমাকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সময়ে স্বচ্ছতা ও সময়মত তথ্য সরবরাহই মূল চাবিকাঠি।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মূলধন সুরক্ষা এবং লাভের হার স্থিতিশীল করার মাধ্যমে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তবে বাজারে এখনও কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, বিশেষ করে গ্রাহক আস্থা ও লিকুইডিটি সংক্রান্ত।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে ব্যাংকের লাভের হার এবং সরকারী সমর্থনের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা উল্লেখ করেন, যদি সরকার অতিরিক্ত সমর্থন বজায় রাখতে পারে এবং ব্যাংক কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণার মাধ্যমে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জমাকারীরা ফেব্রুয়ারি ১ থেকে লাভ পেতে পারবেন, মূলধন সুরক্ষিত থাকবে এবং সরকার ৪ শতাংশ অতিরিক্ত সমর্থন প্রদান করবে। এই পদক্ষেপগুলো ব্যাংকের পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করতে এবং গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে লক্ষ্যভেদী।



