বাংলাদেশ সরকার বৃহস্পতিবার জানিয়েছে যে, ভারতে আটকে থাকা ১২৮ জন বাংলাদেশি মৎস্যজীবীকে সফলভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। একই সময়ে, বাংলাদেশে আটকে থাকা ২৩ জন ভারতীয় মৎস্যজীবীকেও ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই প্রত্যাবাসন পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান পারস্পরিক প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার আওতায় নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে এই কার্যক্রমটি দ্রুত এবং নিরাপদে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া, মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, ভবিষ্যতে অনুরূপ পরিস্থিতি এড়াতে একই প্রক্রিয়া নিয়মিতভাবে ব্যবহার করা হবে।
বঙ্গোপসাগরের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা বরাবর, বাংলাদেশি কোস্ট গার্ড এবং ভারতীয় কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে পাঁচটি বাংলাদেশি মালিকানাধীন ফিশিং বোটে থাকা ১২৮ জন মৎস্যজীবীকে নিরাপদে গ্রহণ করা হয়েছে। একই সময়ে, দুইটি ভারতীয় ফিশিং বোটে থাকা ২৩ জন ভারতীয় মৎস্যজীবীকে ভারতীয় কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। উভয় পক্ষের দল এই বোটগুলোকে সমুদ্রের নির্ধারিত জোনে থামিয়ে, প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা এবং নথিপত্র যাচাইয়ের পরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বহু সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা দেখা গেছে। প্রতিটি সংস্থা তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করে, যেমন নৌবাহিনীর সহায়তা, সীমানা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মৎস্যজীবীদের পরিচয় যাচাই করা। এই সমন্বিত কাজের ফলে প্রক্রিয়াটি দ্রুত এবং কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের সমন্বিত প্রত্যাবাসন ব্যবস্থা দুই দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও মানবিক সহযোগিতার একটি মাইলফলক। তারা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত চুক্তি ও যৌথ পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম বাড়ছে, যা মৎস্যজীবীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতীতের কিছু উত্তেজনা সত্ত্বেও, উভয় পক্ষের এই সক্রিয় পদক্ষেপগুলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে অতীতের কিছু উত্তেজনা সত্ত্বেও, উভয় দেশের সমন্বিত পদক্ষেপগুলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করেন, ভবিষ্যতে নিয়মিত সমুদ্র patrol এবং তথ্য শেয়ারিং মেকানিজমের মাধ্যমে অনধিক সমস্যার সমাধান হবে। এছাড়া, দুই দেশের নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের যৌথ প্রশিক্ষণ ও সমুদ্র নিরাপত্তা চর্চা এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সহায়ক হবে।
এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, বাংলাদেশ সরকার ও ভারতীয় সরকার যৌথভাবে একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করার পরিকল্পনা জানিয়েছে, যা সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধের দ্রুত সমাধান এবং মৎস্যজীবীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে। কমিটি প্রতি ত্রৈমাসিক সভা করে বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবে এবং প্রয়োজনীয় নীতি সংশোধনের সুপারিশ করবে। এই উদ্যোগটি দুই দেশের কূটনৈতিক সংলাপকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে দৃঢ় করবে।
এছাড়া, দু’দেশের মৎস্য মন্ত্রণালয়গুলো সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই মাছ ধরা নিয়ে নতুন নীতি প্রণয়নে সহযোগিতা বাড়াবে বলে জানিয়েছে। যৌথ গবেষণা প্রকল্প, ডেটা শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম এবং পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্যোগের মাধ্যমে মৎস্যশিল্পের দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা নিশ্চিত করা হবে। এই নীতি পরিবর্তনগুলো শুধুমাত্র মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা নয়, বরং সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সারসংক্ষেপে, ১২৮ জন বাংলাদেশি মৎস্যজীবীর নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং ২৩ জন ভারতীয় মৎস্যজীবীর সমানভাবে ফেরত পাঠানো, দুই দেশের কূটনৈতিক সংলাপের ফলশ্রুতি এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই সফল প্রত্যাবাসন ভবিষ্যতে আরও সমন্বিত সামুদ্রিক সহযোগিতা এবং মানবিক সহায়তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।



