ভ্যান্ডালিজম বলতে মালিকের অনুমতি ছাড়া সম্পত্তি ধ্বংস বা বিকৃত করা বোঝায়, এবং এটি দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নগর পরিবেশে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। এই অপরাধের মূল বৈশিষ্ট্য হল উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্মৃতি, পরিচয় এবং সভ্যতার সঞ্চিত জ্ঞানকে ক্ষতিগ্রস্ত করা।
ইতিহাসে ভ্যান্ডালিজমের শব্দটি গৃহীত হয়েছে জার্মানিক গোষ্ঠী ভ্যান্ডালসের নাম থেকে, যাদের রোমের স্যাকিংকে প্রায়ই সভ্যতার পতনের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যদিও ঐ সময়ের ঘটনাগুলি অতিরঞ্জিত হতে পারে, তবে আধুনিক গবেষকরা এই নামকে আজকের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বর্ণনা হিসেবে ব্যবহার করেন।
প্রচলিতভাবে প্রতিবাদ এবং ভ্যান্ডালিজমকে আলাদা করা হয়; প্রতিবাদে প্রতীকী কাজ ও সংলাপের মাধ্যমে ক্ষমতার চ্যালেঞ্জ করা হয়, আর ভ্যান্ডালিজমে ঐ প্রতীকগুলোকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়। মব হিংসা ও ভ্যান্ডালিজম কখনও কখনও একসঙ্গে দেখা যায়, তবে মব হিংসা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্ভূত হতে পারে, আর ভ্যান্ডালিজমে পরিকল্পনা ও ইচ্ছাকৃত কাজের উপস্থিতি বেশি।
পশ্চিমা ও ইউরোপীয় ইতিহাসে গথিক ক্যাথেড্রাল, রোমান ফোরাম এবং মধ্যযুগীয় দুর্গের ধ্বংসের উদাহরণ দেখা যায়, যেখানে কাঠামো ভাঙা শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, বরং ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও সামাজিক পরিচয়ের ক্ষতিও ঘটায়। একই ধরণের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে রেকর্ড করা হয়েছে, বিশেষ করে বাঙালির ডেল্টা অঞ্চলে।
বঙ্গের প্রাচীন নগরগুলোতে মুঘল, সুলতান এবং ব্রিটিশ শাসনের সময় নির্মিত মসজিদ, মন্দির ও সরকারি ভবনগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ভ্যান্ডালিজমের চিহ্ন দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯শ শতাব্দীর শেষের দিকে কিছু ঐতিহাসিক মসজিদে অজানা ব্যক্তিদের দ্বারা রঙের গুঁড়ো ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ঐ স্থাপনার মূল নকশা ও ধর্মীয় মূল্যকে ক্ষুণ্ন করেছে।
উপনিবেশের পর স্বাধীনতা অর্জনের পরও ভ্যান্ডালিজমের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরের বছরগুলোতে পুরনো সরকারি ভবন ও ঐতিহাসিক স্মারকগুলোতে গ্রাফিতি ও ভাঙচুরের রিপোর্ট পাওয়া যায়। এসব কাজ প্রায়ই রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সামাজিক অশান্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেখা যায়, তবে সেগুলোকে সরাসরি প্রতিবাদ হিসেবে নয়, বরং ঐতিহ্যের প্রতি আক্রমণ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে ভ্যান্ডালিজমকে “সাংস্কৃতিক ব্যাকটেরিয়া” হিসেবে বিবেচনা করা যায়, যা জাতির সাংস্কৃতিক DNA-কে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। এই ধারণা অনুসারে, যখন ঐতিহাসিক কাঠামো ধ্বংস হয়, তখন সমাজের স্মৃতি ও পরিচয়ের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়, ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঐতিহ্যগত জ্ঞান হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশের বর্তমান নগরায়ণ প্রক্রিয়ায় ভ্যান্ডালিজমের ঝুঁকি বাড়ছে। দ্রুত বাড়তি নগর নির্মাণ, অবৈধ নির্মাণ ও অপরিকল্পিত শহুরে উন্নয়নের ফলে ঐতিহাসিক স্থানগুলো প্রায়শই নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হয় অথবা সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ উপেক্ষা করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কিছু পুরনো ভবনে ভাঙচুরের ঘটনা বাড়ার রিপোর্ট পাওয়া গেছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ভ্যান্ডালিজমের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে, তবে প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। অপরাধের শাস্তি নির্ধারণে দণ্ড ও জরিমানা অন্তর্ভুক্ত, তবে বাস্তবিকভাবে অপরাধী সনাক্ত করা ও মামলা চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশাসনিক দিক থেকে, ঐতিহাসিক স্থান রক্ষার জন্য বিশেষ সংস্থা গঠন এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। কিছু শহরে ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটি গঠন করা হয়েছে, তবে তাদের কার্যক্রমে তহবিলের অভাব ও নীতি বাস্তবায়নের অপ্রতুলতা লক্ষ্য করা যায়।
সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক স্থাপনার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করা এবং তরুণ প্রজন্মকে ঐতিহ্য রক্ষার মূল্যবোধ শেখানো ভ্যান্ডালিজমের প্রবণতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু নগর পরিকল্পনা প্রকল্পে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, তবে বাস্তবায়নে বিলম্ব ও পরিকল্পনা পরিবর্তনের ফলে সেগুলো প্রায়শই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
ভবিষ্যতে ভ্যান্ডালিজমের ঝুঁকি কমাতে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা, রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া, নগর উন্নয়নের সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন, যাতে নগরায়ণ প্রক্রিয়ায় ঐতিহ্য হারিয়ে না যায়।
সারসংক্ষেপে, ভ্যান্ডালিজম শুধুমাত্র শারীরিক ধ্বংস নয়, এটি সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাঙালির সমৃদ্ধ ডেল্টা ইতিহাসে এই প্রবণতা দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে, এবং আধুনিক সময়ে নগরায়ণ ও সামাজিক অস্থিরতার সঙ্গে এটি নতুন রূপ নিচ্ছে। যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা, সংরক্ষণ নীতি এবং জনসচেতনতা একসাথে কাজ করলে ভ্যান্ডালিজমের প্রভাব কমিয়ে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।



