নির্বাচন কমিশন ২৮ জানুয়ারি তারিখে একটি চিঠি জারি করে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার না করার কঠোর নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশনা উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেনের স্বাক্ষরে রিটার্নিং অফিসারদের কাছে প্রেরণ করা হয় এবং ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত ভোটের আগে সকল রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর উপর বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হবে।
চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আচরণ বিধিমালা ২০২৫-এর ধারা-৭(ক) অনুসারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং কেবল নির্ধারিত লিফলেট, হ্যান্ডবিল বা অন্যান্য অনুমোদিত ছোট মুদ্রণ সামগ্রী ব্যবহার করা যাবে। রিটার্নিং অফিসারদের দায়িত্বে রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রিন্টিং প্রেস ও ছাপাখানাগুলিকে পোস্টার মুদ্রণ না করতে নির্দেশ দেওয়া এবং লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তি আরোপের ব্যবস্থা করা।
এই পদক্ষেপের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে পরিবেশ রক্ষা ও নির্বাচনী ব্যয়ের অতিরিক্ততা নিয়ন্ত্রণ উল্লেখ করা হয়েছে। পোস্টার ও বড় ব্যানার প্রিন্টিংয়ে প্রচুর কাগজের ব্যবহার এবং তা থেকে সৃষ্ট বর্জ্য পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে কমিশন উল্লেখ করে, ফলে কাগজের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিয়মের অধীনে প্রার্থীরা এখন কেবল লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন এবং নির্দিষ্ট আকারের ব্যানার ব্যবহার করতে পারবে, তবে সেগুলোরও নির্দিষ্ট মাপ ও স্থাপন নিয়ম মেনে চলতে হবে। এই শর্ত ভঙ্গ করলে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল বা জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, ডিজিটাল যুগে দৃশ্যমান পোস্টার বা দেয়াল লিখনের চেয়ে অনলাইন ক্যাম্পেইন, ভিডিও বার্তা এবং সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন অধিক কার্যকর। তাই পোস্টারবিহীন প্রচারণা কেবল পরিবেশের জন্যই নয়, তথ্যের দ্রুত বিস্তার ও আধুনিক ভোটারদের পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মাঠ পর্যায়ে নিয়মের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে রিটার্নিং অফিসার ও স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো লঙ্ঘন ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিএনপি ও জাটিয়া পার্টির প্রতিনিধিরা পোস্টার নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তারা যুক্তি দেন যে গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকায় পোস্টার এখনও ভোটারদের কাছে তথ্য পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম। তারা দাবি করেন যে পোস্টারবিহীন প্রচারণা কিছু ভোটার গোষ্ঠীর জন্য তথ্যের ঘাটতি তৈরি করতে পারে এবং তা নির্বাচনী সমতা নীতির লঙ্ঘন হতে পারে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলা হয়েছে যে, ডিজিটাল ও সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে সংলাপ বাড়বে এবং প্রচারণার খরচ কমে যাবে। তারা উল্লেখ করে যে, পোস্টারবিহীন প্রচারণা ভোটারদের কাছে পরিষ্কার ও নির্ভুল তথ্য পৌঁছানোর নতুন পথ খুলে দেবে।
পরিবেশ সংরক্ষণে সক্রিয় কিছু এনজিও ও নাগরিক গোষ্ঠীও এই সিদ্ধান্তকে প্রশংসা করেছে। তারা বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় কাগজের অপচয় কমে পরিবেশের ওপর চাপ হ্রাস পাবে এবং এটি অন্যান্য সামাজিক কার্যক্রমের জন্য একটি ইতিবাচক উদাহরণ স্থাপন করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে পোস্টারবিহীন নিয়মের ফলে দলগুলো তাদের প্রচারণা কৌশল পুনর্বিবেচনা করবে, বিশেষত দরজায়-দরজায় ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি আলাপের ওপর জোর বাড়বে। একই সঙ্গে সামাজিক মিডিয়া ও মোবাইল অ্যাপের ব্যবহার বাড়বে, যা তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সহায়ক হবে।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত ভোটের আগে দেশজুড়ে প্রচারণা তীব্রতর হয়ে উঠেছে। দলগুলো এখন পোস্টার নয়, লিফলেট ও ডিজিটাল কন্টেন্টের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। এই পরিবর্তন নির্বাচনী ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তি পদ্ধতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, পোস্টারবিহীন নির্বাচনী প্রচারণা একটি নতুন নিয়মাবলী হিসেবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা পরিবেশ রক্ষা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক যোগাযোগ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে লক্ষ্যস্থির। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে এই নীতির বাস্তব প্রভাব ও রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোজন ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা হবে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে উঠবে।



