যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর সীমিত আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা কয়েক দিনের মধ্যে বাস্তবায়িত হতে পারে। যদি তেহরানের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে কোনো চুক্তি না হয় এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে আক্রমণ আদেশ দেন, তবে ফলাফল কী হতে পারে তা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার বিষয়। এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের লক্ষ্য, পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য পরিণতি এখনো স্পষ্ট নয়, তবে বিভিন্ন দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পদক্ষেপ সম্ভবত সীমিত এবং নির্ভুল আক্রমণ হবে, যেখানে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড (IRGC) ও বাসিজ ইউনিটের সামরিক ঘাঁটি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চ সাইট এবং পারমাণবিক সুবিধা লক্ষ্য করা হবে। এই ধরনের আক্রমণকে ‘সুনির্দিষ্ট’ বলা হয়, কারণ এতে বৃহৎ নাগরিক ক্ষতি কমানো এবং কেবলমাত্র সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের লক্ষ্য থাকে।
সুনির্দিষ্ট আক্রমণের পর যদি ইরানের শাসন কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে কিছু বিশ্লেষক একটি দ্রুত গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা উল্লেখ করেন। এই দৃশ্যপটে, বর্তমান শাসনভঙ্গের পর ইরানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হতে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সময় দেওয়া হবে। তবে ইরাক ও লিবিয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায়, পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপের পর দীর্ঘমেয়াদে বিশৃঙ্খলা এবং সহিংসতা বৃদ্ধি পায়, ফলে স্বচ্ছন্দ গণতন্ত্র গঠন কঠিন হয়ে পড়ে।
সিরিয়ার ২০২৪ সালের অভ্যন্তরীণ বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যেখানে প্রেসিডেন্ট বশার আল-আসাদকে পশ্চিমা সামরিক সহায়তা ছাড়া উচ্ছেদ করা হয় এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। ইরানের ক্ষেত্রে কিছু বিশ্লেষক ‘ভেনেজুয়েলান মডেল’ উল্লেখ করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত এবং শক্তিশালী পদক্ষেপ শাসনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে তার নীতি কিছুটা শিথিল করে। এই মডেলে ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র টিকে থাকে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের সহিংস মিলিশিয়ার সমর্থন কমায়, পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রোগ্রাম সীমিত করে এবং দেশীয় প্রতিবাদ দমনকে হ্রাস করে।
এই দৃশ্যপটটি তুলনামূলকভাবে কম সম্ভাব্য বলে বিবেচিত হয়, কারণ ইরানের শাসন ৪৭ বছর ধরে স্থিতিশীল এবং পরিবর্তনের প্রতি প্রতিরোধী। বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, বর্তমান শাসন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে, যদিও তা জনমতকে সন্তুষ্ট না করে। ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ এবং আন্তর্জাতিক চাপের পরেও শাসনবাহিনীর দৃঢ়তা এবং সামরিক ক্ষমতা এটিকে পরিবর্তন করা কঠিন করে তুলেছে।
যদি শাসন অপরিবর্তিত থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। ইরান তার মিত্র দেশ ও গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ, তেল অবকাঠামো এবং সাইবার নেটওয়ার্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এমন প্রতিক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্র থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রাম এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে আক্রমণকে একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে তারা একই সঙ্গে জোর দেন যে কোনো সামরিক পদক্ষেপের আগে শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ অনুসন্ধান করা হবে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া দুটোই এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ যদি সীমিত থাকে, তবে তা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতিমালার আলোকে সমালোচিত হতে পারে, বিশেষ করে নাগরিক ক্ষতি এড়াতে না পারলে। অন্যদিকে, যদি আক্রমণ বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃত হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে বাধ্য করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের ওপর সম্ভাব্য আক্রমণ বিভিন্ন দৃশ্যপটে বিভক্ত, যেখানে সীমিত সুনির্দিষ্ট আক্রমণ থেকে শুরু করে শাসনভঙ্গ, নীতি শিথিলতা এবং শাসন অপরিবর্তিত থাকা পর্যন্ত সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিটি দৃশ্যপটের পরিণতি ভিন্ন, তবে সকলেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিধিতে গভীর প্রভাব ফেলবে। ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এই সম্ভাব্য সংঘাতের দিকনির্দেশ নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।



