অন্তর্বর্তী সরকার শেষ মুহূর্তে জাতীয় গণমাধ্যম অধ্যাদেশ গঠনের প্রক্রিয়ায় ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিচ্ছে, ফলে পূর্বে প্রস্তাবিত গণমাধ্যম কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত বছরের মার্চে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, যার প্রধান ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক কামাল আহমেদ, সরকারকে একটি বিশদ প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে গৃহীত সুপারিশের ভিত্তিতে একটি স্বতন্ত্র কমিশন গঠন ও তার ক্ষমতা নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
কামাল আহমেদ উল্লেখ করেছেন, ত্বরান্বিতভাবে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করলে মূল উদ্দেশ্য—একটি স্বতন্ত্র ও কার্যকরী গণমাধ্যম কমিশন—সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে কিনা তা নিশ্চিত করা কঠিন। তিনি আরও সতর্ক করেছেন, যদি বর্তমান প্রেস কাউন্সিলের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে, তবে নতুন কমিশনের কাজের পরিধি ও দায়িত্বে অতিরিক্ত জটিলতা দেখা দিতে পারে। একই কাজের দায়িত্ব দুইটি সংস্থার মধ্যে ভাগ হলে, তা সংকটের সম্ভাবনা বাড়াবে।
তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সরকার বাকি মেয়াদে উভয় অধ্যাদেশ অনুমোদনের চেষ্টা করবে, তবে এই সময়ের মধ্যে নতুন কমিশন গঠন করা সম্ভব নাও হতে পারে। রিজওয়ানা উল্লেখ করেছেন, প্রেস কাউন্সিলকে জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনের সঙ্গে সংযুক্ত করলে বৃহত্তর কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব হতো, তবে বর্তমানে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন পূর্বে গণমাধ্যম কমিশন এবং সাংবাদিক সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছিল। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, গণমাধ্যম কমিশনই সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেবে, আর সম্প্রচার সংক্রান্ত বিষয়—যেমন লাইসেন্সের সুপারিশ—সম্প্রচার কমিশন পরিচালনা করবে। রিজওয়ানা উল্লেখ করেন, যদিও দুইটি অধ্যাদেশের অনুমোদন অব্যাহত থাকবে, তবু নতুন কমিশনের গঠন এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, যদি অধ্যাদেশ কার্যকর হয়, তবে ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। এই সংস্থার প্রধান কার্যালয় থাকবে, এবং প্রয়োজন অনুসারে সরকারের অনুমোদন নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে শাখা কার্যালয় গঠন করা যাবে। কমিশনের কাঠামোতে একজন চেয়ারম্যান এবং আটজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা পূর্বের প্রেস কাউন্সিলের তুলনায় অধিক স্বায়ত্তশাসন ও বিস্তৃত ক্ষমতা প্রদান করবে বলে ধারণা।
কামাল আহমেদ এবং রিজওয়ানা দুজনই একমত যে, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশের পূর্ণ বাস্তবায়নই সর্বোত্তম হবে। তারা জোর দিয়ে বলেন, আলাদা দুটি কমিশন গঠন করলে কাজের দ্বৈততা ও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বাড়তে পারে। তবে রিজওয়ানা স্বীকার করেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন কমিশন গঠন করা কঠিন, এবং সরকারের অগ্রাধিকার এখনো অধ্যাদেশ অনুমোদনের দিকে কেন্দ্রীভূত।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি সরকার ত্বরান্বিতভাবে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাঠামো পরিবর্তন না করে, তবে গণমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসন ও সাংবাদিক সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, যদি সরকার শেষ পর্যন্ত একটি স্বতন্ত্র গণমাধ্যম কমিশন গঠন করে, তবে তা মিডিয়া শিল্পে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপের পরবর্তী ধাপ হবে উভয় অধ্যাদেশের পার্লামেন্টে অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তন। সরকার যদি নতুন কমিশন গঠন না করে, তবে প্রেস কাউন্সিলের বর্তমান ক্ষমতা ও দায়িত্বে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে, যা মিডিয়া পরিবেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, অন্তর্বর্তী সরকার শেষ মুহূর্তে গণমাধ্যম অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে দ্রুত অনুমোদনের পথে অগ্রসর হলেও, গণমাধ্যম কমিশনের গঠন ও তার কার্যকারিতা নিয়ে এখনও স্পষ্টতা নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একমত যে, সুপারিশের পূর্ণ বাস্তবায়নই সর্বোত্তম ফলাফল দেবে, তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এই লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে, তা দেশের গণমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসন ও সাংবাদিক সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্ধারণ করবে।



