দাকোপ‑বতিয়াঘাট, খুলনা—সোমবারে দুই উপজেলা জুড়ে অবস্থিত এই নির্বাচনী এলাকা পরিদর্শন করার সময়, ভোটারদের হাতে অচেনা ভোটপত্র দেখা গেল। ভোটের তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত, আর ভোটারদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা সর্বোচ্চ, যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। এই প্রেক্ষাপটে ভোটের পছন্দ কীভাবে গঠিত হবে, তা এখনই প্রশ্নের মুখে।
দাকোপ‑বতিয়াঘাটের ভূমি সমতল, খাল‑নদী ও বাঁধে ছড়িয়ে আছে, যা কৃষকদের জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দুই উপজেলা মিলিয়ে এখানে হিন্দু ভোটারদের সংখ্যা অন্য যেকোনো সংসদীয় সীটে তুলনায় বেশি, তবে মোট ভোটারসংখ্যার অর্ধেকের নিচে। এই জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্য বহু দশক ধরে স্থানীয় রাজনৈতিক গতিবিধি নির্ধারণ করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু ভোটাররা প্রধানত আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল, যখন তারা একই ধর্মের আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী প্রার্থীকে বেছে নিয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি ১২ তারিখের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকায়, ঐতিহ্যবাহী ভোটের ধারা ব্যাহত হয়েছে।
আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বাজার ও গ্রামগুলো ঘুরে দেখার সময়, হিন্দু ভোটাররা কীভাবে ভোট দেবে, তা নিয়ে প্রশ্নের স্রোত প্রবাহিত হচ্ছিল। এই অনিশ্চয়তাকে তীব্র করে তুলেছে জামায়াত-এ-ইসলামির অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ।
জামায়াত-এ-ইসলামি এই সীটে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং হিন্দু প্রার্থী ক্রিশ্ণা নন্দিকে নামানিবেশ করেছে। ইসলামিক পার্টি দ্বারা হিন্দু প্রার্থী নামানিবেশ করা, বিশেষ করে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত। এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে নতুন আলোচনার সঞ্চার করেছে।
বটবুনিয়া বাজারে, সুগন্ধা নদীর তীরবর্তী একটি ছোট পোশাকের দোকানে, কয়েকজন স্থানীয় একত্রিত হয়েছেন। দোকানটি সাধারণ, শেলফে গাঁটানো শার্ট, পুরনো কাঠের বেঞ্চ ও ছাদে ঝুলন্ত সিলিং ফ্যান দেখা যায়। তবে এখানে চলমান কথোপকথন সাধারণের চেয়ে বেশি তীব্র।
দোকানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় পুরোহিত দেবাশীষ চক্রবর্তী, দোকান মালিক দিবেন্দু রায়, ব্যবসায়ী নিহার রঞ্জন রায়, দর্জি সীমানা সরকার এবং মুসলিম ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদ গাজী, যার ভাই স্থানীয় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। সবাই স্পষ্টভাবে তাদের বিভ্রান্তি প্রকাশ করেছেন।
দিবেন্দু রায় সরাসরি বললেন, “আমরা সবসময় আওয়ামী লীগে ভোট দিই—এটা শত শতাংশ সত্য।” তিনি যোগ করেন, “এখন নৌকা চিহ্ন নেই, আমার জন্য এটা খুবই বিভ্রান্তিকর।” অন্যরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
প্রশ্ন করা হলে, তারা কীভাবে ভোট দেবেন, দিবেন্দু রায় কিছুক্ষণ থেমে বলেন, “আমরা এমন কাউকে বেছে নিতে চাই যে অন্তত ১৯৯০‑এর স্বাধীনতা আদর্শের আত্মা ধারণ করে।” তিনি স্পষ্ট করেন, “যদি প্রার্থী আমাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে আমরা তার দিকে ঝুঁকতে পারি।”
এই পরিস্থিতি স্থানীয় রাজনৈতিক গতিবিধিতে নতুন মোড় আনতে পারে। জামায়াত-এ-ইসলামির হিন্দু প্রার্থীকে সমর্থন করা হিন্দু ভোটারদের মধ্যে পার্টির প্রতি ধারণা পরিবর্তন করতে পারে, অথবা ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি তাদের অন্য কোনো বিকল্পের দিকে ধাবিত করতে পারে। উভয় পার্টি এখনই ভোটারদের উদ্বেগ শোনার এবং তাদের প্রত্যাশা মেটানোর চেষ্টা করছে।
নির্বাচন পর্যন্ত সময় কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে, প্রার্থীরা ক্যাম্পেইন বাড়িয়ে তুলছে এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করছে। হিন্দু ভোটারদের জন্য কোন পার্টি বা প্রার্থী তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক স্বার্থ রক্ষা করবে, তা এখনই মূল প্রশ্ন। ফলাফল কী হবে, তা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমতা ও স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলবে।



