ইরান বুধবার সমুদ্রের নিচে অবস্থিত মিসাইল সুড়ঙ্গের নকশা ও কার্যপ্রণালী প্রকাশ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রকাশের মাধ্যমে ইরান তার সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ক্ষমতা ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতা উভয়ই দৃশ্যমান করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন, এই পদক্ষেপটি পারস্পরিক নিরাপত্তা কাঠামোর উপর নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সুড়ঙ্গগুলিতে কয়েকশ ক্রুজ মিসাইল সংরক্ষিত রয়েছে, যাদের পরিসীমা এক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। মিসাইলগুলোকে সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে, যা শত্রু সনাক্তকরণকে কঠিন করে তুলবে। ইরানের সামরিক বিশ্লেষকরা জানান, এই নকশা শত্রু নৌবাহিনীর আক্রমণকে প্রতিহত করার পাশাপাশি দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে সুনির্দিষ্ট আঘাত হানতে সক্ষম।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে, ইরান “কাদের ৩৮০ এল” মিসাইলের মধ্যে উন্নত স্মার্ট সিস্টেম সংযোজন করেছে, যা লক্ষ্যবস্তুকে আঘাতের মুহূর্ত পর্যন্ত ট্র্যাক করতে পারে। এই সিস্টেমটি রাডার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক সেন্সর ব্যবহার করে, ফলে মিসাইলের সঠিকতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং ক্ষমতা আধুনিক যুদ্ধের গতিবিদ্যাকে পরিবর্তন করতে পারে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড নৌবাহিনীর একজন কমান্ডার উল্লেখ করেছেন, সুড়ঙ্গের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, তবে কোনো আক্রমণ হলে এই ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়বে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি হুমকির মুখে পড়ে, তবে হরমুজের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যাবে। এই সতর্কতা ইরানের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি স্পষ্ট সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সামরিক পদক্ষেপের হুমকি প্রকাশ করেন। ট্রাম্পের মন্তব্যে তিনি ইরানকে বলছেন, যদি ইরান কোনো আক্রমণ বন্ধ করতে চায়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে করতে হবে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়ন নিষিদ্ধ করতে হবে। এই বক্তব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক, যিনি গোপনীয়তা বজায় রেখেছেন, মন্তব্য করেন, “ইরানের এই সামুদ্রিক মিসাইল অবকাঠামো উন্মোচন অঞ্চলীয় শক্তি ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অপারেশনাল পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন, ইরানের এই পদক্ষেপটি কেবলমাত্র প্রতিরক্ষা নয়, বরং আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর একটি কৌশলগত চাল।
অঞ্চলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ইরানের এই পদক্ষেপটি পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন জটিলতা যোগ করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরব, ইতিমধ্যে ইরানের সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং দ্বিপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে উত্তেজনা হ্রাসের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে, ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের সূক্ষ্মতা এই নতুন সামরিক সক্ষমতার আলোকে পুনরায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা হচ্ছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই উত্তেজনা কমিয়ে আনা। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, হরমুজ সিস্টেমের সুরক্ষা ও মিসাইল সুড়ঙ্গের স্বচ্ছতা নিয়ে পারস্পরিক সমঝোতা গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের রক্ষণশীলতা ও কৌশলগত স্বার্থের টানাপোড়েনের ফলে দ্রুত সমাধান অর্জন কঠিন হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ইরানের সমুদ্রের নিচের মিসাইল সুড়ঙ্গের উন্মোচন কেবলমাত্র একটি সামরিক প্রকাশ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার নতুন পর্যায়কে সূচিত করেছে। এই উন্নয়ন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন, কূটনৈতিক সংলাপের জরুরি প্রয়োজন এবং আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যের পুনর্মূল্যায়নের সূচক হিসেবে কাজ করবে।



