অস্থায়ী সরকার কর্তৃক অক্টোবর ২০২২-এ গঠিত জাতীয় কর সংস্কার টাস্কফোর্স, ১১ সদস্যের একটি প্যানেল, মঙ্গলবার ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসের কাছে একটি বিশদ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদনে কর ব্যবস্থার জটিলতা কমিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি করার জন্য একাধিক মূলধারার পরিবর্তন প্রস্তাব করা হয়েছে।
টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে আছেন জায়েদি সাত্তার, যিনি পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (PRI) এর চেয়ারম্যান। প্যানেলটি সরকারী নীতি নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত।
প্রস্তাবের প্রধান বিষয় হল ন্যূনতম করের ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা। বর্তমান ন্যূনতম কর কোম্পানির মোট আয় ভিত্তিক নির্ধারিত হয়, ফলে লাভ বা ক্ষতি বিবেচনা করা হয় না, যা ব্যবসায়িক চাপ বাড়ায়।
এর পাশাপাশি, সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশের সম্পদ সংযোজন করের হারকে সরিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে। উচ্চ হারটি করদাতাদের ট্যাক্স এড়িয়ে চলার প্রণোদনা তৈরি করেছে, ফলে স্বেচ্ছায় অনুগততা কমে গেছে।
ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আরোপিত এক্সাইজ ডিউটি বাতিলেরও সুপারিশ করা হয়েছে। এই চার্জটি গৃহস্থালি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ব্যবহার থেকে বিরত রাখে, ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রতিবেদনটি মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়কর থ্রেশহোল্ড নির্ধারণের পরামর্শ দেয়। এই পদ্ধতি করদাতাদের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে করের বোঝা হ্রাস করবে এবং কর সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে সহজ করবে।
টাস্কফোর্সের লক্ষ্য হল সরাসরি করের অংশকে মোট কর রাজস্বের অর্ধেকের কাছাকাছি নিয়ে আসা। বর্তমানে সরাসরি করের অবদান মোট রাজস্বের তুলনায় কম, যা আর্থিক কাঠামোর ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে।
এই সংস্কার উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের কম কর-জিডিপি অনুপাতের উদ্বেগ। দেশটি যখন সর্বনিম্ন উন্নত দেশ (LDC) থেকে মুক্তি পেতে চায়, তখন রাজস্ব বাড়ানোর চাপ বাড়ছে।
প্রতিবেদনটির শিরোনাম “Tax Policy for Development: A Reform Agenda for Restructuring the Tax System” এবং এতে দেশের কর ব্যবস্থা “অনাবশ্যকভাবে জটিল, অকার্যকর এবং পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল” বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
দলটি মোট ৩০টি নীতি সংক্রান্ত সমস্যার তালিকা তৈরি করে, যার মধ্যে সরাসরি করের গঠনমূলক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বিশেষভাবে সাতটি মূল বিষয় চিহ্নিত করে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের রূপরেখা দেয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত লক্ষ্য হল ২০২৩ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাতকে ১০ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে বৃদ্ধি করা, এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে নিয়ে যাওয়া। এই সংখ্যাগুলি অর্জনের জন্য কর কাঠামোর পুনর্গঠন, করদাতার রেজিস্ট্রেশন সহজীকরণ এবং ট্যাক্স এডমিনিস্ট্রেশন ডিজিটালাইজেশনকে মূল কৌশল হিসেবে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি জোর দেয় যে কর ব্যবস্থার সরলীকরণ ও বোঝা কমিয়ে আনা সরাসরি রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াবে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক প্রতিযোগিতামূলকতা বৃদ্ধি করবে। ন্যূনতম কর ও সম্পদ সংযোজন করের বাতিল, পাশাপাশি এক্সাইজ ডিউটির অপসারণ, ব্যবসা ও গৃহস্থালির জন্য আর্থিক পরিবেশকে আরও স্বচ্ছ ও অনুকূল করবে।
ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসের অনুমোদনের পর, সরকার এই সুপারিশগুলোকে আইনসভার আলোচনার বিষয়বস্তু করে তুলতে প্রস্তুত। সংশোধিত নীতি বাস্তবায়নের সময়সূচি ও প্রক্রিয়া নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বিত কাজ করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, টাস্কফোর্সের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো কর ব্যবস্থার জটিলতা হ্রাস, সরাসরি করের অংশ বাড়ানো এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর দিকে কেন্দ্রীভূত, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



