ইরান সরকার ৮ জানুয়ারি থেকে চালু করা ইন্টারনেট বন্ধের প্রায় তিন সপ্তাহ পর, দেশের কিছু ব্যবহারকারী আবার সংযোগ স্থাপন করতে পারছেন। তবে পুনরায় চালু হওয়া সেবাটি সম্পূর্ণ নয়, সীমিত সময় ও নির্দিষ্ট সাইটে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
ইন্টারনেট বন্ধের মূল কারণ হিসেবে ইরান সরকারের মুখপাত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে এবং “সন্ত্রাসী কার্যক্রম” থামাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরকার তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
শার্ঘ সংবাদপত্রের রিপোর্টে দেখা যায়, কিছু সরকারি সূত্র মোবাইল ডেটা পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে ব্যবহারকারীরা এখনও প্রায়শই সংযোগ বিচ্ছিন্নতা, ধীর গতি এবং নির্দিষ্ট সময়ের পরই সেবা বন্ধ হওয়ার সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
ইন্টারনেট ট্র্যাফিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলি উল্লেখ করেছে যে, নেটওয়ার্কে অস্থায়ী সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে, তবে তা ধারাবাহিক নয়। কিছু প্রধান সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক সময়ে প্রবেশযোগ্য, আবার অন্য সময়ে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এই অনিয়মিত প্যাটার্ন ব্যবহারকারীদের জন্য পরিষেবার নির্ভরযোগ্যতা হ্রাস করেছে।
কেন্টিক নেটওয়ার্ক ইন্টেলিজেন্স ফার্মের ডিরেক্টর ডগ ম্যাডরি উল্লেখ করেন, বর্তমান অবস্থা স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সাইটের অনুমতি ও বাধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এই ধরনের পরিবর্তন রিয়েল-টাইমে করা হচ্ছে, যা ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাকে অস্থির করে তুলছে।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ গোষ্ঠী নেটব্লকসও একই রকম ফলাফল প্রকাশ করেছে। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল এখনও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন, যদিও কিছু শহরে সীমিত সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, ইরান সরকার নতুন ধরনের ট্র্যাফিক ফিল্টারিং সিস্টেম পরীক্ষা করছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট সেবা বা অ্যাপ্লিকেশন ব্লক করতে পারে। এই সিস্টেমের কার্যক্রম রিয়েল-টাইমে পরিবর্তিত হওয়ায় ব্যবহারকারীরা কখন কোন সাইটে প্রবেশ করতে পারবেন তা পূর্বাভাস করা কঠিন।
মিয়ান গ্রুপের সাইবার সিকিউরিটি ডিরেক্টর আমির রাশিদি উল্লেখ করেন, বর্তমানে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত কিছু ব্যবহারকারীই স্থায়ীভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন। অন্য সব ব্যবহারকারীকে সীমিত সময়ের জন্যই সংযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা তথ্যের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা গুলি এই নিয়ন্ত্রণকে প্রতিবাদকারীদের ওপর তথ্যের প্রবেশাধিকার সীমিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা বলেন, ইন্টারনেটের আংশিক বন্ধের ফলে দেশের ভিতরে ও বাইরে ঘটমান ঘটনাবলী সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার সক্রিয়তা সংবাদ সংস্থা (HRANA) জানিয়েছে, ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত তারা ৫,৯২৫ জন প্রতিবাদকারী মৃত্যুর নিশ্চিত তথ্য সংগ্রহ করেছে। এই সংখ্যা সরকারী সূত্রের তুলনায় বেশি, যা ইন্টারনেট বন্ধের ফলে সঠিক তথ্য সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি করেছে।
সারসংক্ষেপে, ইরান সরকার ইন্টারনেটের কিছু অংশ পুনরায় চালু করেছে, তবে তা অত্যন্ত সীমিত এবং নিয়ন্ত্রিত। ব্যবহারকারীরা এখনো নির্দিষ্ট সময়ে এবং নির্দিষ্ট সাইটে সীমিত প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন, যখন অধিকাংশ অঞ্চল এখনও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন। এই পরিস্থিতি তথ্যের স্বচ্ছতা ও নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে প্রভাবিত করছে।



