ইরানের কেন্দ্রীয় শহর ইসফাহানে গত সপ্তাহে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণের ফলে আহত প্রতিবাদকারীরা হাসপাতাল না গিয়ে গোপন চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন। গুলিবর্ষণটি দেশের এই মাসের ব্যাপক বিরোধী-সরকারি প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র দমনমূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ঘটেছে।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী তরুণা ও তার সঙ্গীকে নিরাপত্তা বাহিনীর মোটরসাইকেল চালকরা গুলিবর্ষণ করার আগে চিৎকার করে ভিড়কে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেন। এক সশস্ত্র সদস্যের সঙ্গে কথোপকথনের পর তিনি তৎক্ষণাৎ কয়েকটি গুলি চালান, যার ফলে দুজনই মাটিতে পতিত হয়ে রক্তে ভেজা পোশাক পরিধান করে।
গুলিবর্ষণের পর দুজনকে অচেনা এক গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। তবে তারা হাসপাতালে যাওয়ার বিষয়ে ভয় পেয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে, কারণ নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ও গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা ছিল। গলির মোড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ঘন ঘন উপস্থিতি দেখে তারা কাছের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিতে স্থানীয় দম্পতির দরজায় অনুরোধ করে।
দম্পতির ঘরে রাতভর লুকিয়ে থাকা দুইজনের অবস্থা তীব্র রক্তক্ষরণে ভুগছিল। ভোরের আগে তারা পরিচিত একজন ডাক্তারকে খুঁজে পায়, যিনি তাদের পায়ের গুলিবর্ষণজনিত ক্ষত পরিষ্কার করেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন।
পরবর্তীতে একটি সার্জন বাড়িতে এসে কিছু গুলিবর্ষণ থেকে বের করা সম্ভব হয়, তবে তিনি জানিয়ে দেন যে সব গুলি দেহে থেকে যাবে এবং সম্পূর্ণ অপসারণ সম্ভব নয়। এই সীমিত চিকিৎসা সত্ত্বেও তারা গুলিবর্ষণের পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়ে যায়।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় সব নাম গোপন রাখা হয়েছে যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিরাপদ থাকে। গোপনীয়তা রক্ষার জন্য নাম পরিবর্তন করা হয়েছে, তবে ঘটনার মূল তথ্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ইসফাহানে ঘটনার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনমূলক কার্যক্রম চালু রয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন নিষেধাজ্ঞার ফলে পুরো দমনকাণ্ডের প্রকৃত মাত্রা জানার সুযোগ সীমিত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা HRANA অনুযায়ী, এই মাসের দমনকালে ৬,৩০১ জনের মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে, যার মধ্যে ৫,৯২৫ জন প্রতিবাদকারী, ১১২ জন শিশু, ৫০ জন পথচারী এবং ২১৪ জন সরকারী কর্মী অন্তর্ভুক্ত। সংস্থা আরও ১৭,০৯১ জনের অতিরিক্ত মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
HRANA আরও জানিয়েছে যে অন্তত ১১,০০০ জন প্রতিবাদকারী গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। এই সংখ্যার মধ্যে অনেকেই হাসপাতালে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন, কারণ গ্রেফতার বা অতিরিক্ত শাস্তির ঝুঁকি তাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। ফলে তারা গোপন চিকিৎসা কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবী ডাক্তার ও নার্সের সাহায্যে স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
গোপন চিকিৎসা নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ফলে প্রতিবাদকারীদের মধ্যে চিকিৎসা সেবার অভাব ও দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর হুমকি ও গ্রেফতার ভয় প্রতিবাদে অংশগ্রহণের ইচ্ছাকে দমন করতে পারে, যা সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতি ইরানের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন জটিলতা যোগ করেছে। গুলিবর্ষণ ও গোপন চিকিৎসা উভয়ই নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নীতি ও প্রতিবাদকারীদের বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতিফলন। ভবিষ্যতে নিরাপত্তা বাহিনীর দমনমূলক পদক্ষেপের তীব্রতা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন কীভাবে বিকশিত হবে, তা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



