বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের মোট অর্থছাড় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ কমেছে। এই হ্রাস দেশের আর্থিক প্রবাহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নির্দেশ করে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ছয় মাসের মধ্যে মোট ২৪৯ কোটি ৯৭ লাখ ডলার ঋণ ও অনুদান ছাড় হয়েছে, যেখানে পূর্ববছরে একই সময়ে এই পরিমাণ ৩৫৩ কোটি ২৪ লাখ ডলার ছিল। ফলে মোট অর্থছাড়ের পরিমাণে প্রায় এক তৃতীয়াংশের বেশি হ্রাস ঘটেছে।
অবশ্যই, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইআরডি জানিয়েছে, এই সময়ে ছাড়ের পরিমাণ গত বছরের সমমানের তুলনায় ২৬ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি ছিল। অর্থাৎ, বছরের শুরুর দিকে ঋণ গ্রহণে তীব্রতা দেখা গিয়েছিল।
বাকি পাঁচ মাসে প্রবাহের ধারা পরিবর্তিত হয়েছে। শেষ পাঁচ মাসে মোট ১৯৫ কোটি ডলার অর্থছাড় হয়েছে, যা পূর্ববছরের একই সময়ে ১৫৪ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের তুলনায় বেশি। যদিও পরিমাণ বাড়লেও, সামগ্রিক ছয় মাসের গড়ে হ্রাসের প্রবণতা বজায় রয়েছে।
এই আর্থিক সূচকগুলোর পরিবর্তন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গত অর্থবছরের শুরুর দিকে বিভিন্ন সূচকে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, এবং এখন ঋণ ছাড়ের হ্রাসও সেই ধারার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতিতে উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটেছে। ইআরডি জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ১৯৯ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতি করা হয়েছে, যেখানে পূর্ববছরে একই সময়ে ২২৯ কোটি ৮৬ লাখ ডলার ছিল। ফলে প্রতিশ্রুতির পরিমাণে ১৩ দশমিক ৪২ শতাংশের পতন ঘটেছে।
প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়া ঋণ গ্রহণের সম্ভাব্য পরিসরে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিল সংগ্রহে। সরকারকে এখন বেশি করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবহার করতে হবে অথবা বিকল্প তহবিলের সন্ধান করতে হবে।
অন্যদিকে, সরকারী ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। ইআরডি অনুসারে, প্রথম ছয় মাসে সরকার মোট ২১৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে, যা পূর্ববছরে ১৯৮ কোটি ১৭ লাখ ডলারের তুলনায় ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি।
পরিশোধের এই বৃদ্ধি ঋণ শোধের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের আস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করবে। তবে একই সঙ্গে ঋণ গ্রহণের হ্রাসের ফলে ভবিষ্যতে নগদ প্রবাহের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিদেশি ঋণের প্রবাহের হ্রাস রপ্তানি, নির্মাণ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের গতি ধীর করতে পারে। তদুপরি, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া রুপির মানে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, যদি ঋণ ছাড়ের হ্রাস ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে, তবে সরকারকে বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য কর সংগ্রহ বাড়াতে বা সরকারি ব্যয় পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার শর্তাবলী কঠোর হলে ঋণ পুনর্গঠন বা পুনরায় ঋণ গ্রহণে অতিরিক্ত শর্ত আরোপিত হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, চলতি অর্থবছরের প্রথম অর্ধে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের মোট ছাড়ে ২৯ শতাংশের উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটলেও, বছরের শুরুর পাঁচ মাসে প্রবাহের তীব্রতা এবং ঋণ পরিশোধের বৃদ্ধি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা যায়। তবে কমে যাওয়া ঋণ প্রতিশ্রুতি এবং সম্ভাব্য তহবিল ঘাটতি সরকারকে আর্থিক নীতি পুনর্বিবেচনা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত করবে।
এই প্রবণতা ভবিষ্যতে দেশের ঋণ কাঠামো, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং মুদ্রা বাজারের গতিবিধিতে প্রভাব ফেলবে, তাই নীতিনির্ধারকদের সতর্ক দৃষ্টিতে এই সূচকগুলো পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।



