আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পূর্ণ সম্মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে একটি খোলাচিঠি প্রকাশ করেছেন। চিঠিটি লন্ডনভিত্তিক সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে উদ্বেগের সঞ্চার ঘটেছে।
চিঠিতে ক্যালামার্ড উল্লেখ করেন, নির্বাচনের সময় মৌলিক স্বাধীনতার ওপর আরোপিত বেআইনি বিধিনিষেধ জনসাধারণের মুক্ত আলোচনা ও ভোটার অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা হ্রাস করে। তিনি বিশেষ করে ২০২৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের (ATA) অপব্যবহারকে প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন।
অ্যামনেস্টি সংস্থা উল্লেখ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার সাংবাদিক ও সমালোচকদের দমন করতে ATA‑এর ধারাগুলি অতিরিক্তভাবে ব্যবহার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম (পান্না) কে আগস্ট ২০২৫-এ ‘অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাতের চেষ্টার’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। একই আইনের অধীনে ডিসেম্বরে সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে ‘আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর’ অভিযোগে আটক করা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই গ্রেপ্তারকে মতপ্রকাশ ও সমাবেশের অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চিঠিতে অতিরিক্তভাবে ১৮ ডিসেম্বরের সহিংসতা ঘটনার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। শরিফ ওসমান বিন হাদি নিহত হওয়ার পর দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল, এবং নিউ এজের সম্পাদক নূরুল কবীরকে হেনস্তা করা হয়। একই দিনে ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দু নাগরিক দীপু চন্দ্র দাসের ওপর গণপিটি চালানো হয়, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অ্যামনেস্টি সংস্থা এই ঘটনাগুলিকে নির্বাচন পূর্বের মানবাধিকার সুরক্ষার ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করে, এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আইন, নীতি ও বিধান প্রয়োগে ত্বরান্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানায়। তারা জোর দিয়ে বলেন, মৌলিক স্বাধীনতার ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা না থাকলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়নি, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে এই ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ সরকারকে মানবাধিকার রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারে। নির্বাচনের আগে যদি এই উদ্বেগগুলো সমাধান না হয়, তবে ভোটার অংশগ্রহণ ও ফলাফলের বৈধতা উভয়ই প্রভাবিত হতে পারে।
অ্যামনেস্টি সংস্থার চিঠি প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংস্থা ও মানবাধিকার কর্মী সমাবেশে একত্রিত হয়ে সরকারকে আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছেন। তারা দাবি করছেন, সাংবাদিক ও সমালোচকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মুখ্য উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন সময়ে মানবাধিকার সংস্থার এই ধরনের সরাসরি আহ্বান সরকারকে নীতি সংশোধন ও আইনি কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে প্ররোচিত করতে পারে।
অবশেষে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উল্লেখ করেছে, নির্বাচনের পূর্বে মানবাধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়বে। তারা সরকারকে তৎকালীন পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সময়সীমা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে ভোটারদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়।



