আজ একটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে ইইউর পররাষ্ট্র নীতি প্রধান কাজা ক্যালাস ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করার জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইউরোপকে ন্যাটোকে আরও ইউরোপীয় করে তার সামর্থ্য বজায় রাখতে হবে, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্যালাস বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইউরোপের অংশীদার ও মিত্র থাকবে, তবে কোনো মহান শক্তি কখনোই তার অস্তিত্ব অন্যের ওপর অর্পণ করে টিকে থাকতে পারেনি। এই বক্তব্যে তিনি ঐতিহাসিক উদাহরণে ইঙ্গিত করে দেখিয়েছেন যে স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা ছাড়া কোনো দেশ টিকে থাকতে পারে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড, একটি ড্যানিশ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, দখল করার হুমকি ইউরোপ-আমেরিকা সম্পর্কের উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছিল। ক্যালাসের মতে, এই ঘটনা ইউরোপের নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে।
ন্যাটোর চেয়ারম্যান মার্ক রুটে পূর্বে ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের মন্তব্যে বলেছিলেন, ইউরোপ যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে চায় তবে তা কেবল স্বপ্ন। রুটের এই মন্তব্যের পর ক্যালাসের বক্তব্যের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।
ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোত রুটের মন্তব্যের জবাবে জোর দিয়ে বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে এবং এটি ন্যাটোর ইউরোপীয় স্তম্ভের মাধ্যমে সম্ভব। তিনি যুক্তি দেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই ইউরোপীয় স্তম্ভের সমর্থন করে।
ক্যালাস উল্লেখ করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে ইউরোপ আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু নয়; তাই ইউরোপকে জাতীয় স্বার্থের বদলে সমষ্টিগত ইউরোপীয় স্বার্থে কাজ করতে হবে। তিনি এটাও জোর দেন যে এই পরিবর্তন সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত।
ইইউ ও ন্যাটোর উভয় সদস্য ২৩টি দেশকে এই পরিবর্তনের দায়িত্বে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে বলা হয়েছে। ক্যালাসের মতে, এই দেশগুলোকে তাদের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সমন্বয় করে ন্যাটোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।
ইউরোপীয় স্তম্ভের স্বতন্ত্রতা ও মূল্য যোগ করার জন্য ক্যালাস এবং বারোত উভয়ই জোর দিয়ে বলেন, ইউরোপকে ন্যাটোর মধ্যে একটি স্বতন্ত্র, শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে সমগ্র জোটের সামগ্রিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।
গ্রিনল্যান্ড বিষয়ক সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ বিরোধ এই কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রমাণ হিসেবে উঠে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের ওপর তার পরিকল্পনা সমর্থন না করা ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
মার্ক রুটে শেষ সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি প্রত্যাহার করার পর পরিস্থিতি কিছুটা শমিত হয়। রুটের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপকে ক্যালাস প্রশংসা করেন এবং এটিকে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তাত্ক্ষণিক উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ক্যালাসের বক্তব্যের পর ইউরোপীয় দেশগুলোতে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো, যৌথ অস্ত্র উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম ত্বরান্বিত করার দাবি বাড়ছে। তিনি ভবিষ্যতে ইইউ ও ন্যাটোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে একটি স্বতন্ত্র ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপের স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, ক্যালাসের আহ্বান অনুসরণে ইউরোপীয় দেশগুলো ন্যাটোর মধ্যে নিজেদের স্বতন্ত্র ভূমিকা সুদৃঢ় করতে নীতি ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনবে, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের পুনঃসংজ্ঞা করবে। এই প্রক্রিয়ায় ইউরোপের নিরাপত্তা নীতি কীভাবে রূপান্তরিত হবে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজরদারির বিষয় হয়ে থাকবে।



