যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী সির কেয়ার স্টার্মার আজ বেইজিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে চীন সরকারের প্রতিনিধিদের স্বাগতের মধ্যে তিন দিনের সরকারি সফর শুরু করেছেন। এটি আট বছর পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চীন সফর, যা দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত। স্টার্মার যুক্তরাজ্যের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে “কৌশলগত ও ধারাবাহিক” সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে সফরের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
সফরের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে বাণিজ্যিক চুক্তি, বিনিয়োগের সুযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়কে শক্তিশালী করা উল্লেখ করা হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাজ্য‑চীন সম্পর্কের ওপর রাজনৈতিক উত্তেজনা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের ছায়া পড়ে, তাই স্টার্মার এই সফরকে দুই দেশের মধ্যে সেতু গড়ার একটি পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ব্রিটিশ বিরোধী দলগুলো থেকে সফরকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা এসেছে। তারা চীনের জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি, শি জিনপিংয়ের মানবাধিকার রেকর্ড এবং হংকংয়ের গণমাধ্যম টায়কুন জিমি লাইয়ের ওপর চলমান মামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে চীনের ইউগুর জনগণের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে হংকংয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দমনকে নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সির কেয়ার স্টার্মার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৃহস্পতিবারের সাক্ষাৎ নির্ধারিত হয়েছে। দুজন নেতার মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু সরকারীভাবে প্রকাশ না করা হলেও, স্টার্মার পূর্বে করা সফরে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি এই সফরে নির্দিষ্ট কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন তা স্পষ্টভাবে জানাতে অস্বীকার করেছেন।
বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে স্টার্মারকে চীনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা স্বাগত জানিয়ে একটি ফুলের তোড়া উপস্থাপন করেন। তিয়ানআনমেন স্কোয়ারে যুক্তরাজ্যের ইউনিয়ন পতাকা উড়িয়ে তোলা হয়, যা দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এই আনুষ্ঠানিক স্বাগত অনুষ্ঠানের পর স্টার্মার ৬০ জন ব্রিটিশ ব্যবসায়িক নেতার সঙ্গে একটি সমাবেশে অংশ নেন, যেখানে তিনি উপস্থিতদেরকে ইতিহাস গড়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করে দেশের স্বার্থের জন্য সক্রিয়ভাবে সুযোগ অনুসন্ধান করার আহ্বান জানান।
স্টার্মার তার ভাষণে জোর দিয়ে বলেছিলেন যে যুক্তরাজ্য “বহির্মুখী” হতে চায়, আন্তর্জাতিক বাজারে সুযোগ গ্রহণ করতে এবং দীর্ঘমেয়াদী পারস্পরিক সম্পর্ক গড়তে প্রস্তুত। তিনি উল্লেখ করেন যে দেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ রেখে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই বক্তব্যে তিনি যুক্তরাজ্যের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন।
যুক্তরাজ্যের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা একটি জটিল রাজনৈতিক বিষয়। চীনকে ইউগুর জনগণের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং হংকংয়ের গণমাধ্যম স্বায়ত্তশাসনের ওপর দমনমূলক নীতি গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে দাঁড়াতে হয়েছে। যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার সংস্থা এবং কিছু পার্লামেন্টের সদস্য এই নীতিগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে, যা সরকারের চীন নীতির ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে, চীনের গোয়েন্দা কার্যক্রমের ব্যাপকতা নিয়ে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা সংস্থা MI5 সম্প্রতি সতর্কতা জারি করেছে। MI5-এর প্রধানের মতে, চীনের রাষ্ট্র পরিচালিত গোপন অপারেটররা যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তার জন্য দৈনন্দিন হুমকি সৃষ্টি করে। এই সতর্কতা স্টার্মারের সফরের সময়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনার একটি সম্ভাব্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীন সরকারও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়াতে ইচ্ছুক বলে প্রকাশ করেছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে উভয় দেশের মধ্যে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং পর্যটন ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। তবে এই সহযোগিতা কী মাত্রায় মানবাধিকার ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগকে সমন্বয় করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সফরের পরবর্তী দিনগুলোতে স্টার্মার চীনের বিভিন্ন শহরে ব্যবসায়িক ফোরাম এবং সাংস্কৃতিক ইভেন্টে অংশ নেবেন। এই ইভেন্টগুলোতে যুক্তরাজ্যের কোম্পানিগুলো চীনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ অনুসন্ধান করবে, একই সঙ্গে চীনের বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাজ্যের উচ্চ প্রযুক্তি ও পরিষেবা খাতে আগ্রহ প্রকাশ করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, স্টার্মারের চীন সফর যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তবে মানবাধিকার ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো যদি সমাধান না হয়, তবে এই সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
সফরের শেষ দিনে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উভয় পক্ষের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা নির্ধারণের চেষ্টা করবেন। এই বৈঠক থেকে কী ফলাফল বের হবে, তা যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে এবং জনমতেও ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। স্টার্মার সফর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সরকার চীনের সঙ্গে নতুন চুক্তি ও সহযোগিতা পরিকল্পনা প্রকাশের সম্ভাবনা রাখে, যা দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতিতে প্রভাব ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, সির কেয়ার স্টার্মারের বেইজিং সফর যুক্তরাজ্যের জন্য বাণিজ্যিক সুযোগ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা বহন করে, তবে মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতার প্রশ্নগুলোকে সমাধান না করা পর্যন্ত এই সম্পর্কের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন কঠিন বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।



