সান্ডান্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গত সপ্তাহে ‘দ্য এআই ডক’ শিরোনামের নতুন ডকুমেন্টারি প্রথমবারের মতো প্রদর্শিত হয়েছে। ড্যানিয়েল রোহার এবং চার্লি টায়ারেল একসাথে পরিচালনা করা এই চলচ্চিত্রটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। চলচ্চিত্রের মোট সময় ১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট, এবং এটি প্রযুক্তি, সমাজ এবং নৈতিকতার সংযোগস্থলে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।
ড্যানিয়েল রোহার পূর্বে অস্কার জয়ী ‘নাভালনি’ ডকুমেন্টারির মাধ্যমে রাজনৈতিক বিষয়কে সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করার দক্ষতা দেখিয়েছেন। এইবার তিনি এবং সহ-পরিচালক চার্লি টায়ারেল এআই প্রযুক্তির জটিলতা এবং তার সামাজিক প্রভাবকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। রোহার নিজেই চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র হিসেবে ক্যামেরার সামনে উপস্থিত হয়ে বিজ্ঞানী, সামাজিক বিশ্লেষক এবং কর্পোরেট নেতাদের সঙ্গে আলাপ করেন।
চলচ্চিত্রের কাঠামো রোহারের ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের চারপাশে গড়ে উঠেছে; তিনি স্টুডিওতে বসে এআই বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর করেন এবং তার নিজের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন। এই পদ্ধতি দর্শকদেরকে রোহারের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও ঝুঁকি উভয়ই অনুভব করতে সাহায্য করে। তার প্রশ্নগুলো প্রায়শই দৈনন্দিন জীবনের উদাহরণে ভিত্তিক, যা বিষয়টিকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
চলচ্চিত্রে উপস্থিত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কম্পিউটার বিজ্ঞানী, নৈতিকতা গবেষক এবং বড় কর্পোরেশনের সিইও অন্তর্ভুক্ত। তারা এআইয়ের উন্নয়ন, ডেটা গোপনীয়তা, স্বয়ংক্রিয় কর্মসংস্থান এবং মানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এর প্রভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। রোহার তাদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে প্রযুক্তির সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করার চেষ্টা করেন।
দৃশ্যমান দিক থেকে চলচ্চিত্রটি একটি রঙিন ক্যালিডোস্কোপের মতো, যেখানে আর্কাইভাল সংবাদ ক্লিপ, রোহারের হাতে আঁকা স্কেচ, অ্যানিমেশন এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার একসাথে মিশে যায়। এই ভিজ্যুয়াল মিশ্রণ তথ্যকে সহজে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সহায়তা করে এবং একই সঙ্গে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ক্যামেরা এবং আলো ব্যবহার করে বিশেষজ্ঞদের মুখের অভিব্যক্তি স্পষ্টভাবে ধরা হয়েছে, যা কথোপকথনের স্বচ্ছতা বাড়ায়।
সম্পাদনার গতি দ্রুত, যা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিকে প্রতিফলিত করে। রোহারের উচ্ছল মানসিক অবস্থা এবং প্রযুক্তির অস্থির প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তুলতে দৃশ্যগুলো ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তিত হয়। যদিও গতি কখনও কখনও তীব্র মনে হতে পারে, তবে তা বিষয়ের জরুরি স্বভাবকে জোরদার করে এবং দর্শকের মনোযোগ বজায় রাখে।
চলচ্চিত্রটি এআইয়ের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক উভয়ই সমানভাবে বিশ্লেষণ করে। স্বয়ংক্রিয় চিকিৎসা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সুবিধা তুলে ধরা হয়েছে, পাশাপাশি কর্মসংস্থান হ্রাস, গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং অ্যালগরিদমিক পক্ষপাতের ঝুঁকি উল্লেখ করা হয়েছে। রোহার এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি দর্শকদেরকে সমন্বিতভাবে বিষয়টি বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
বিশেষভাবে, চলচ্চিত্রে কর্মসংস্থান পরিবর্তন, নজরদারি প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা সৃষ্ট নৈতিক দ্বন্দ্বের উদাহরণগুলো বিশদভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এই বিষয়গুলোকে বাস্তব জীবনের কেস স্টাডি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা দর্শকের জন্য বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে। রোহার নিজে এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় তার মুখের অভিব্যক্তি এবং স্বরের পরিবর্তনও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
সান্ডান্সে উপস্থিত দর্শকরা চলচ্চিত্রের গতিশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিকোণকে প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে রোহারের ক্যামেরার সামনে উপস্থিতি এবং তার সরল প্রশ্নগুলোকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। অনেক দর্শক চলচ্চিত্রের শেষে এআই নিয়ে নিজেদের মতামত গঠন করার সুযোগ পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন।
সামগ্রিকভাবে সমালোচকরা চলচ্চিত্রের তথ্যবহুল বিষয়বস্তু এবং সৃজনশীল ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিকে প্রশংসা করেছেন। যদিও কিছু সমালোচক গতি দ্রুত হওয়ায় কিছু বিষয়ের গভীর বিশ্লেষণ বাদ পড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবুও চলচ্চিত্রের সামগ্রিক প্রভাবকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এআই নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনমত গঠনে এই ডকুমেন্টারির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য বলে ধরা হয়েছে।
প্রযুক্তি-সচেতন দর্শক এবং সাধারণ জনসাধারণ উভয়ের জন্যই এই চলচ্চিত্রটি উপযোগী। ১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটের সময়সীমা তথ্যের ঘনত্ব বজায় রেখে যথেষ্ট বিশদ প্রদান করে, ফলে বিষয়টি সহজে হজম করা যায়। সান্ডান্সে প্রদর্শনের পর থেকে বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে এই চলচ্চিত্রের প্রচার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, ‘দ্য এআই ডক’ এআই প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে একটি সমৃদ্ধ ডকুমেন্টারি উপস্থাপন করে। রোহার এবং টায়ারেলের যৌথ পরিচালনা, গতিশীল ভিজ্যুয়াল স্টাইল এবং বিস্তৃত বিশেষজ্ঞ সাক্ষাৎকারের সমন্বয় চলচ্চিত্রটিকে তথ্যবহুল এবং আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এআই নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে ইচ্ছুক যে কোনো পাঠকের জন্য এই চলচ্চিত্রটি একটি মূল্যবান রেফারেন্স হতে পারে।



