বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মিলনায়তনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পরবর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ব্যবসা জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আজম জে চৌধুরি উপস্থিত থেকে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিবেশের সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। তিনি বিশেষভাবে জমি মিউটেশন প্রক্রিয়ায় ঘুষের বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জটিলতার দিকে ইঙ্গিত করেন।
চৌধুরি উল্লেখ করেন যে, পূর্বে জমি মিউটেশন সম্পন্ন করতে ডি.সি. অফিসে এবং তার শাখা গুলিতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ টাকা অনানুষ্ঠানিকভাবে দিতে হতো। তবে আজকাল একই প্রক্রিয়ার জন্য প্রায় দশ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে। তিনি এই প্রক্রিয়াকে ‘হাঁসফাঁস’ ও ‘চাঁদাবাজি’ শব্দে বর্ণনা করে, সরকারি কর্মচারী ও মধ্যস্থতাকারীদের দ্বারা সৃষ্ট অতিরিক্ত চাপের কথা জানান।
বক্তা প্রশ্ন তোলেন, দেশে সত্যিকারের কোনো সংস্কার গৃহীত হয়েছে কি না। তিনি উল্লেখ করেন, আমদানি করা পণ্যের উপর কর পরিশোধের এক দিনের মধ্যে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স হওয়া উচিত, কিন্তু বাস্তবে তা প্রায়শই এক থেকে এক অর্ধ মাসের বেশি সময় নেয়। এই দেরি কেবল ব্যবসায়িক খরচ বাড়ায় না, বরং বিনিয়োগকারীর আস্থা ক্ষয় করে।
চৌধুরি আরও বলেন, অনেক পণ্য বুয়েট (বেঙ্গলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন) এ পাঠিয়ে পুনরায় কাস্টমসের কাছে ফেরত আনা হয়, যার ফলে প্রক্রিয়াটি এক মাস বা তার বেশি সময় নিতে পারে। এই ধীরগতি মাইক্রো স্তরে ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে, যদিও ম্যাক্রো স্তরে কিছু নীতি পরিবর্তন গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মাইক্রো স্তরের সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করে ম্যাক্রো রিফর্মের কথা বলা অর্থহীন।
ম্যাক্রো রিফর্মের ক্ষেত্রে তিনি স্বীকার করেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর সুপারিশের কিছু অংশ সরকার গ্রহণ করেছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজের পদ্ধতি তেমন পরিবর্তন হয়নি, যা ব্যবসায়িক পরিবেশকে অপরিবর্তিত রাখে। তিনি উল্লেখ করেন, শীর্ষ স্তরে দৃশ্যমান সংস্কার হলেও তা মাটিতে পৌঁছায় না, ফলে ব্যবসায়িক লেনদেনের গতি ধীর হয়ে যায়।
বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য তিনি সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়কে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে অস্থায়ী এনজিওগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। তদুপরি, এলপিজি ও এলএনজি সরবরাহের জন্য কোনো নীতি গঠন করা হয়নি, এবং প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরকারী সহযোগিতা সীমিত। এই ঘাটতিগুলো দেশের শক্তি নিরাপত্তা ও শিল্প উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
চৌধুরি জোর দিয়ে বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস করা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, যদি জমি মিউটেশন, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং জ্বালানি সরবরাহের প্রক্রিয়া সহজ করা না হয়, তবে দেশীয় ও বিদেশী উভয় বিনিয়োগকারীই অন্য বাজারে পা বাড়াতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি নীতি নির্ধারকদের দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।
সেমিনারের প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, আর ইআরএফের প্রেসিডেন্ট দৌলত আকতার মালা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন, ব্র্যাক ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল মোমেন এবং ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. কামালউদ্দিন জসিম উপস্থিত ছিলেন।
সমাপনী বক্তব্যে চৌধুরি পুনরায় জোর দেন, মাইক্রো স্তরের সংস্কার ছাড়া ম্যাক্রো রিফর্মের কোনো বাস্তব প্রভাব নেই। তিনি সকল সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে আহ্বান জানান, জমি মিউটেশন, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং জ্বালানি সরবরাহের প্রক্রিয়া সরলীকরণ করে একটি স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে। এই ধরনের পদক্ষেপই দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হবে।



