রাজনৈতিক বিজ্ঞানী রওনক জাহান, গবেষণা ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের পরিচালক, ২৮ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকা শহরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইসফেনদিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব: সংকট ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন। অনুষ্ঠানটি ঢাকা স্ট্রিম, নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম (FWPR) ও ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ যৌথভাবে আয়োজন করেছে।
রওনক জাহান উল্লেখ করেন, সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নির্বাচিত মহিলা সংসদ সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, বরং ৩০০ জন পুরুষ সংসদ সদস্যের ভোটে নির্বাচিত হন। এই প্রক্রিয়া তাদের প্রতিনিধিত্বের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে, কারণ তারা মূল ভোটার গোষ্ঠীর চেয়ে একটি ছোট পুরুষ গোষ্ঠীর পছন্দের ফলাফল।
তিনি ১৯৭৩ সাল থেকে সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছেন এবং সেই সময়ের লেখালেখি থেকে প্রমাণ পেয়েছেন যে, কোটা ব্যবস্থা পার্টির অভ্যন্তরে থাকা উচিত, সংরক্ষিত আসন নয়। পার্টিগুলো যদি নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে নারী কোটার ব্যবস্থা করে, তবে তা সরাসরি জনগণের ভোটের মাধ্যমে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারে।
ইতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে রওনক জাহান ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে নারীদের সরাসরি জয়কে উল্লেখ করেন, যেখানে বহু নারী প্রার্থী সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে ১৯৭৩ সালে সংরক্ষিত আসন প্রবর্তনের পর থেকে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে, যা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সহজ পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাতে তারা নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার দায়িত্ব থেকে পিছু হটে।
গোলটেবিল আলোচনায় তিনি নিজের গবেষণা অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ভোটার ও সংসদ সদস্যদের উপর জরিপ পরিচালনা করেন এবং দেখেন, যদিও নারী ভোটাররা মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক গঠন করতেন, তাদের ভোটের সিদ্ধান্ত প্রায়শই পরিবারের পুরুষ সদস্য, যেমন স্বামী বা পিতা, দ্বারা প্রভাবিত হতো। এই প্রভাবের ফলে নারীদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত ছিল।
রওনক জাহান জোর দিয়ে বলেন, পাঁচ দশক পরেও এই পরিস্থিতি কতটা পরিবর্তিত হয়েছে তা মূল্যায়ন করা জরুরি। তিনি বর্তমান সময়ে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্তর ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বায়ত্তশাসনের মাত্রা পুনরায় পর্যালোচনা করার আহ্বান জানান।
আলোচনার অংশ হিসেবে তিনি নারী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের গঠনেও সমালোচনা করেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, বেশিরভাগ নারী সংগঠনের শীর্ষে পুরুষদের উপস্থিতি বেশি, যা নারীর স্বতন্ত্র নেতৃত্বের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। এই বিষয়টি সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করে তিনি বলেন, উভয় ক্ষেত্রেই নারীর স্বায়ত্তশাসন সীমিত হচ্ছে।
গোলটেবিলের অংশগ্রহণকারীরা রওনক জাহানের মতামতকে সমর্থন করে, বিশেষ করে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা উল্লেখ করেন, সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের উপস্থিতি বাড়লে নীতি নির্ধারণে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট হবে।
অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক দল সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দেন যে, এটি নারীর রাজনৈতিক প্রবেশের প্রাথমিক সোপান হিসেবে কাজ করে। তবে রওনক জাহান এই যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, বাস্তবে এটি নারীর স্বতন্ত্র নেতৃত্ব গড়ে তোলার পরিবর্তে পার্টির অভ্যন্তরে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
গোলটেবিলের সমাপনী অংশে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের প্রস্তাবও উঠে আসে। অংশগ্রহণকারীরা সংরক্ষিত আসন বাতিল করে পার্টির অভ্যন্তরে কোটার ব্যবস্থা প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়। এছাড়া, নারী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়ন প্রোগ্রাম চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
রওনক জাহান উল্লেখ করেন, এই ধরনের সংস্কার না হলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায় বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে অর্জন করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে পার্টির অভ্যন্তরে কোটার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলে নারীর নেতৃত্বের গুণগত মান উন্নত হবে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।
এই আলোচনার পর, ঢাকা স্ট্রিম, FWPR ও ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ সংরক্ষিত আসন সংস্কারের জন্য একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা আগামী মাসে পার্টি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে কোটার কাঠামো ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণের পরিকল্পনা করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যে নারীর ভূমিকা পুনর্গঠন করতে সহায়তা করবে।



