সংরক্ষিত নারী আসনের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করতে ২৮ জানুয়ারি বিকেলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মিলনায়তনে একটি গোলটেবিল সভা অনুষ্ঠিত হয়। “রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব: সংকট ও সম্ভাবনা” শীর্ষক এই বৈঠকে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য ও আন্তর্জাতিক শাসন বিশেষজ্ঞ মীর নাদিয়া নিভিন প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সভা ঢাকা স্ট্রিম, নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম (FWPR) এবং ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ যৌথভাবে আয়োজন করেছিল।
বক্তা নিভিন উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি সত্ত্বেও রাজনৈতিক মঞ্চে তাদের অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচনের পরিসংখ্যান দেখায় যে নারীর প্রতিনিধিত্বের হার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক নিচে, যা গ্লাস সিলিংকে অদৃশ্য বাধা হিসেবে রূপান্তরিত করেছে। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র মুখের কথায় নয়, পরিসংখ্যানিক প্রমাণেও স্পষ্ট।
সংরক্ষিত আসনের কার্যকারিতা নিয়ে তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। নিভিনের মতে, এই আসনগুলো নারীর নেতৃত্ব গড়ে তুলতে কোনো বাস্তব ভূমিকা রাখে না; বরং তারা রাজনৈতিক পার্টির জন্য অলংকারের মতো হয়ে দাঁড়ায়। তিনি উল্লেখ করেন, সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হওয়া বেশিরভাগ নারী প্রথমবারের মতোই পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন এবং পুনর্নির্বাচনের সুযোগ পায় না। ফলে, এই প্রতিনিধিত্বের প্রকৃত স্বরূপ প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
বৈঠকে পার্টির প্রতিনিধিরাও মতামত প্রকাশ করেন। তারা দাবি করেন যে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে তারা ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি নারী প্রার্থীকে উৎসাহিত করবে। তবে নিভিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পার্টিগুলোর ইচ্ছা ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে বড় ফাঁক রয়েছে। তিনি বলেন, সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীর প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত না হলে তা কেবল সজ্জা হিসেবে রয়ে যাবে।
নিবন্ধে তিনি জুলাই সনদের ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। নিভিনের মতে, ৫ শতাংশ কোনো লক্ষ্য নয়, বরং সর্বনিম্ন সূচনা মাত্র। তিনি যুক্তি দেন, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে জনসংখ্যার অনুপাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নারী প্রার্থী থাকা উচিত, যাতে নারীর ক্ষমতায়ন সত্যিকারের হয়।
অধিকন্তু, তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে তৃণমূল পর্যায় থেকে নারীর নেতৃত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পার্টিগুলোকে কেবল সংরক্ষিত আসনে নারীর নাম অন্তর্ভুক্ত করার বদলে, তাদেরকে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) সংস্কার করে নারী প্রার্থীর নির্দিষ্ট হার নিশ্চিত করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
নিবিনের মন্তব্যের পর, অংশগ্রহণকারীরা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, পার্টিগুলোর ইচ্ছাশক্তি ছাড়া কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বৈঠকের সমাপ্তিতে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে কেবল সংরক্ষিত আসনের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। বাস্তবিক পদক্ষেপ, পার্টির অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং নির্বাচনী নীতির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। নিভিনের বিশ্লেষণ ও পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি উভয়ই ইঙ্গিত করে যে, যদি গ্লাস সিলিং ভাঙতে না চাওয়া হয়, তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের উন্নয়ন সীমিত থাকবে।
এই আলোচনার পর, বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি সংগঠন ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা একত্রে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেন, যেখানে তারা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে জাতীয় অগ্রগতির মূলধারার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তারা সরকার ও পার্টিগুলোকে আহ্বান জানায়, সংরক্ষিত আসনের বদলে বাস্তবিক ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে নারীর নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে।
সংরক্ষিত আসনের কার্যকারিতা, নারী প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্য এবং পার্টির ভূমিকা নিয়ে এই বিতর্ক, দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে এই বিষয়গুলোতে কী ধরনের নীতি পরিবর্তন আসবে, তা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিবেশের দিক নির্ধারণ করবে।



