ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী সির কেয়ার স্টারমার গত দুই মাসের মধ্যে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে সফর করেন, যা আট বছর পর যুক্তরাজ্যের শীর্ষ স্তরের কূটনৈতিক সফর হিসেবে চিহ্নিত। তিনি চীন সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্যিক চুক্তি ও বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান করার উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। সফরটি চীনের শীতল আবহাওয়া এবং কঠোর শীতের মাঝেও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শহরের হ্রদ ও নদী হিমশীতল অবস্থায় থাকে।
স্টারমারের সফরের আগে ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, আয়ারল্যান্ড, কানাডা ও ফিনল্যান্ডের নেতারা বেইজিংয়ে ভ্রমণ করে থাকেন, এবং জার্মান চ্যান্সেলরও আগামী মাসে চীনে আসার পরিকল্পনা করেছেন। এই ধারাবাহিক সফরগুলোকে চীনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনে চীনের জন্য একটি বৃহৎ দূতাবাস নির্মাণের অনুমোদন দেয়, যা চীনের কূটনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। চীন সরকার পূর্বে এই বিষয়টি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত স্টারমারের সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল, তবে উভয় পক্ষের সমঝোতার পর এখন আলোচনা টেবিলে বসার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যুক্তরাজ্যের জন্য নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করবে। চ্যাথাম হাউসের চীন-এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রোগ্রামের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ডঃ ইউ জি জি উল্লেখ করেন, “যদি দুই পক্ষ যুক্তিসঙ্গত বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, তা ইতিমধ্যে একটি বড় অর্জন।” এই মন্তব্যটি স্টারমারের সফরের মূল লক্ষ্যকে তুলে ধরে।
একই সময়ে বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, চীন কি স্টারমারের মতো পশ্চিমা নেতাদের সফরকে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে চীন তার আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চাইছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় একটি স্থিতিশীল ও পূর্বাভাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে।
চীনের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রায়শই “চার্ম অফেন্স” বলা হয়, যেখানে বিভিন্ন দেশের নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে চীনকে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই কৌশলটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পায়, কারণ চীন তার নিজস্ব মডেলকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রচার করতে চায়।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই মাসের শুরুর দিকে বেইজিংয়ে সফর করেন এবং চীনের সঙ্গে “নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্ব” ঘোষণা করেন। তার সফর চীনের কূটনৈতিক আকর্ষণকে আরও দৃঢ় করে, এবং অন্যান্য বিশ্বনেতাদের জন্য একটি উদাহরণ স্থাপন করে।
কার্নি বেইজিংয়ে তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে বর্তমান বৈশ্বিক শৃঙ্খলা “বিচ্ছিন্নতার পর্যায়ে” রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুনর্গঠনকে নির্দেশ করে। এই মন্তব্যটি চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের গুরুত্বকে আরও জোরদার করে।
স্টারমারের সফর শেষ হওয়ার পর জার্মান চ্যান্সেলরের আসন্ন বেইজিং সফর এবং অন্যান্য দেশের নেতাদের পরিকল্পিত ভ্রমণগুলো চীনের আন্তর্জাতিক নীতির ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে। এই ধারাবাহিকতা যুক্তরাজ্যের জন্য বাণিজ্যিক সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি চীনের বৈশ্বিক অবস্থানকে পুনর্গঠন করার লক্ষ্যে কাজ করবে। ভবিষ্যতে উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর এবং কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়া বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন গতিবিধি তৈরি করতে পারে।



