ঢাকা জুরাইনে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ছয় বছর বয়সী আরিফ হাসান নামের শিশুকে মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণ করা হয় এবং পরে হত্যা করা হয়। মামলাটি গত বুধবার ঢাকা প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. আলমগীরের আদালতে শোনানো হয়। অপরাধে দায়ী চাচাতো ভাই মো. সম্রাটকে জীবদ্দশা কারাদণ্ডের পাশাপাশি দশ হাজার টাকার জরিমানা এবং অনাদায়ে ছয় মাসের অতিরিক্ত শাস্তি আরোপ করা হয়েছে। রায় ঘোষণার পর সম্রাটকে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার মূল ঘটনা ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সন্ধ্যা ছয়টায় শুরু হয়। আরিফ নামাজের জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে আসে না। পরিবার তাকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হওয়ায় কদমতলী থানা-এ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করে। সন্ধ্যা নয়টায় অপরিচিত একজন ফোনে মুক্তিপণ চায় এবং না দিলে শিশুকে হত্যা করার হুমকি দেয়। হুমকি সত্ত্বেও কোনো অর্থ প্রদান না হওয়ায় কলটি বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিবার ভয়ভীত হয়।
পরের দিন সন্ধ্যাকালে অনুসন্ধান চলাকালে সম্রাট এবং তার সঙ্গে থাকা এক শিশুর আচরণে সন্দেহ দেখা যায়। দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদে নেওয়া হয় এবং তারা স্বীকার করে যে, আরিফকে নামাজের পর জুরাইন মেডিক্যাল খানকা শরিফ মসজিদ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে তারা ধরেছে। শিশুটিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভিউ এলাকায় নিয়ে গিয়ে সেখানে ফোনের মাধ্যমে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। আরিফ যদি মুক্তিপণ না দেয় বা অন্যকে জানিয়ে দেয়, তা ভয় পেয়ে তারা তাকে হত্যা করে।
আরোফের বাবা ১৬ সেপ্টেম্বর কদমতলী থানায় মামলাটি দায়ের করেন। তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন থানার এসআই এনায়েত করিম। ৩০ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে তিনি সম্রাট এবং তার সহকারী শিশুকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন। পরবর্তীতে ১১ এপ্রিল ২০১৭ আদালত দুই অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করার আদেশ দেয়।
বিচারকালের শেষে, সম্রাটের বিরুদ্ধে জীবদ্দশা কারাদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাকে দশ হাজার টাকার জরিমানা এবং অনাদায়ে ছয় মাসের অতিরিক্ত শাস্তি আরোপ করা হয়েছে। রায় ঘোষণার পর সম্রাটকে সাজা পরোয়ানা দিয়ে জেলখানায় পাঠানো হয়।
অন্যদিকে, সম্রাটের সঙ্গে থাকা শিশুর মামলা এখনও শিশু আদালতে চলমান রয়েছে। আদালত তার বয়সের বিশেষত্ব বিবেচনা করে পৃথকভাবে শোনাবে এবং শাস্তি নির্ধারণ করবে। বর্তমান পর্যায়ে শিশুর বিরুদ্ধে কোন রায় দেওয়া হয়নি, তবে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, এই মামলায় রায়ে উল্লেখিত জরিমানা এবং অনাদায়ে অতিরিক্ত শাস্তি বাংলাদেশের শাস্তি সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়েছে। অপরাধের গুরুতরতা, শিশুর নিরাপত্তা ও রক্ষা সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে আদালত কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
এই ঘটনার পর, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে শিশু সুরক্ষা ও র্যাঙ্কিং সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে, রাস্তায় নামাজের সময় শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পিতামাতার সতর্কতা এবং প্রতিবেশীর সহযোগিতা প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলাটির মাধ্যমে দেখা যায় যে, মুক্তিপণ দাবির জন্য শিশুকে অপহরণ এবং হত্যা করা একটি গুরুতর অপরাধ, যার শাস্তি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদারকি এবং সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
এই রায়ের পর, সম্রাটের পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কোনো আপিলের তথ্য পাওয়া যায়নি। আদালত রায়ের কার্যকরী হওয়ার পর, সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে শাস্তি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
মামলাটির পরবর্তী পর্যায়ে, শিশুর বিরুদ্ধে চলমান বিচার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শাস্তি নির্ধারিত হবে এবং সমাজে শিশু সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও পদক্ষেপের পুনর্বিবেচনা করা হবে।



