ঢাকা, বুধবার – ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কর্তৃক আয়োজিত “অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পরবর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক সেমিনার ও ইআরএফ শিক্ষাবৃত্তি‑২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ অর্থনীতির সাম্প্রতিক উন্নতি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সম্পর্কে বিশদ মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও বাংলাদেশের অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময়ে পুনরুদ্ধার দেখিয়েছে, তবু বেশ কয়েকটি মৌলিক কাঠামোগত সমস্যার সমাধান এখনো বাকি।
ড. মাহমুদের মতে, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে গিয়েছিল। অবৈধ পাচার ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে সেক্টরটি নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছিল। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের ফলে আর্থিক অবস্থা ধীরে ধীরে উন্নতি লাভ করছে, যদিও সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যের পথে এখনও দীর্ঘ পথ বাকি।
সেমিনারে তিনি উল্লেখ করেন, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধি পেয়ে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে রপ্তানি বৃদ্ধির গতি স্থিতিশীল রয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিদেশি লেনদেনের অবস্থা স্থিতিশীল থাকায় রিজার্ভের পরিমাণও ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং জিডিপি বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি বিষয়ে ড. মাহমুদ জানান, মুদ্রা নীতি নির্ধারক দ্রুত হ্রাসের লক্ষ্য রাখলেও বাস্তবে তা ধীরগতিতে ঘটছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পয়েন্ট‑টু‑পয়েন্ট ভিত্তিতে মুদ্রাস্ফীতি ১১ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। যদিও এই হ্রাস প্রশংসনীয়, তবু আরও ত্বরান্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তিনি জোর দেন।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের উল্লেখযোগ্য হ্রাসের ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) আর্থিক চাপ কমেছে, তবে উচ্চ সুদের হার বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। ড. মাহমুদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এমএসএমইদের জন্য সুদের হার হ্রাস করা উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
শক্তি সেক্টরকে তিনি ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন। গ্যাস সংকটের ফলে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের একটি বড় অংশ ব্যবহারহীন অবস্থায় রয়েছে। যদিও সৌরশক্তি ক্ষেত্রে সম্ভাবনা রয়েছে, তবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে অতীতে কিছু প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করেছে, যার মাধ্যমে বেসরকারি খাতে উৎপাদিত সৌরশক্তি জাতীয় গ্রিডে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে; এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে শক্তি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে বর্তমান সরকার কঠোর নীতি অনুসরণ করছে। সরকারি ক্রয় নীতিমালা সংশোধন করে সব টেন্ডার এখন সম্পূর্ণ অনলাইন ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, ফলে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়ে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমে গেছে। ড. মাহমুদ উল্লেখ করেন, এই পরিবর্তন স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজেটের কার্যকর ব্যবহারেও সহায়ক।
বাজেটের দিক থেকে তিনি সতর্ক করেন, রাজস্ব সংগ্রহের হার জিডিপির তুলনায় এখনও কম। বর্তমান রাজস্ব মূলত পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যবহার হচ্ছে, আর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক ব্যয় ঋণের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
অবশেষে, ড. মাহমুদ আর্থিক লেনদেনে অবৈধ অর্থ পাচার রোধের জন্য আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি জোর দেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।
সারসংক্ষেপে, ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে অগ্রসর হলেও কাঠামোগত দুর্বলতা, শক্তি ঘাটতি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজস্বের সীমিত সংগ্রহের মতো চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান না করা পর্যন্ত স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের চলমান সংস্কার, নীতি পরিবর্তন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণই মূল চালিকাশক্তি হবে।



