ইন্ট্রুসিভ চিন্তা হল অপ্রত্যাশিত, অনিচ্ছাকৃত ভাবনা যা হঠাৎ করে মাথায় আসে এবং ব্যক্তিকে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে। এসব চিন্তা যেকোনো বয়সের মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে, তবে কখনো কখনো এগুলো অতিরিক্ত হয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার দিকে ধাবিত হয়। বিশেষ করে যখন এই ভাবনাগুলো পুনরাবৃত্তি হয় এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে, তখন তা অবসেসিভ‑কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD) এর সূচক হতে পারে।
একটি সাধারণ উদাহরণ হল কোনো মিটিংয়ে বসে হঠাৎ করে “যদি আমি চিৎকার করে ফেলি?” এমন প্রশ্ন মাথায় আসা, অথবা গাড়ি চালানোর সময় “যদি দুর্ঘটনা ঘটে?” এমন ভয়। এসব মুহূর্তে চিন্তা স্বল্পস্থায়ী এবং বেশিরভাগ সময় দ্রুত চলে যায়। তবে কিছু মানুষ এই ধরনের ভাবনাকে নিয়মিতভাবে অনুভব করে এবং তা তাদের মানসিক ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বেশিরভাগ মানুষের জন্য ইন্ট্রুসিভ চিন্তা অস্থায়ী এবং সহজে উপেক্ষা করা যায়, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এই ভাবনাগুলো অতিরিক্ত হয়ে দৈনন্দিন জীবনে বাধা সৃষ্টি করে। এমন ক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজে থেকেই পুনরাবৃত্তি করা আচরণে লিপ্ত হতে পারে, যা OCD এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কম্পালসিভ আচরণ হিসেবে পরিচিত। এই আচরণগুলো মূলত উদ্বেগ কমাতে বা অস্বস্তি দূর করতে করা হয়, যদিও তা স্বল্পমেয়াদে সাময়িক স্বস্তি দেয়।
ড. নিনা হিগসন‑সুইনি ছোটবেলায় বিশ্বাস করতেন যে, যদি তিনি স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে শুধুমাত্র “ভাল” চিন্তা না করেন, তবে তাদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি একবার বলেছিলেন, “একটি ইন্ট্রুসিভ চিন্তা হলে আমি বাস স্টপ থেকে আবার হাঁটা শুরু করতাম, কারণ আমি ভয় পেতাম যে যদি না করি, কিছু ঘটলে তা আমার দোষ হবে।” এই অভিজ্ঞতা তার শৈশবের গভীর উদ্বেগের উদাহরণ।
ড. নিনা ১০ বছর বয়সে OCD নির্ণয় পান এবং বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়-এ শিশু ও কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যের গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি অবসেসিভ এবং কম্পালসিভ আচরণের পার্থক্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে অবসেশন হল অনিচ্ছাকৃত, অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা, অনুভূতি ও শারীরিক অনুভূতি, আর কম্পালশন হল পুনরাবৃত্তি করা, রীতিগত কাজ যা উদ্বেগ কমাতে করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান অনুসারে, মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ থেকে ৪ শতাংশ মানুষ OCD-তে আক্রান্ত। তবে ইংল্যান্ডে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সের তরুণদের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ রিপোর্ট করা ব্যক্তির সংখ্যা গত দশকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইংল্যান্ড এনএইচএস পরিচালিত একটি বৃহৎ সমীক্ষা অনুযায়ী, এখন OCD তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইন্ট্রুসিভ চিন্তা প্রায়শই ব্যক্তির মূল্যবোধ বা পরিচয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়, যা অতিরিক্ত উদ্বেগ ও আত্মসমালোচনার দিকে নিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ প্রিয়জনের ক্ষতি নিয়ে ভয় পেতে পারেন, অথবা নিজের যৌন প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন—যেমন “আমি কি সমকামী?” বা “আমি কি হেটেরোসেক্সুয়াল?” এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পেডোফিলিয়া নিয়ে ভয়ও দেখা দিতে পারে।
অন্য একটি সাধারণ ইন্ট্রুসিভ থিম হল দূষণ ও অসুস্থতার ভয়। অনেক রোগী নিজেদের বা অন্যদের রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তায় ভুগে, ফলে ঘন ঘন হাত ধোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার রীতি অনুসরণ করে। এই ধরনের উদ্বেগ দৈনন্দিন জীবনে অপ্রয়োজনীয় সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে এবং সামাজিক কার্যকলাপে বাধা সৃষ্টি করে।
গবেষণায় দেখা যায়, OCD সাধারণত কিশোরাবস্থায় বা শৈশবের শেষের দিকে প্রকাশ পায়। এই সময়ে হরমোনের পরিবর্তন, সামাজিক চাপ এবং শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, ফলে অবসেসিভ চিন্তা ও কম্পালসিভ আচরণ উদ্ভব হয়। তাই শৈশব ও কিশোর বয়সে দ্রুত সনাক্তকরণ ও হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
ড. নিনা উল্লেখ করেন যে, ইন্ট্রুসিভ চিন্তা নিজে থেকেই অস্বাভাবিক নয়, তবে যখন সেগুলো নিয়মিতভাবে পুনরাবৃত্তি হয় এবং দৈনন্দিন জীবনে বাধা সৃষ্টি করে, তখন পেশাদার সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ, সিবিটি (কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি) এবং প্রয়োজনে ওষুধের ব্যবহার OCD নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হতে পারে।
যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ এই ধরনের চিন্তা নিয়ে ক্রমাগত কষ্ট পাচ্ছেন, তবে দেরি না করে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। প্রাথমিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে উদ্বেগ কমানো এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব। আত্মবিশ্বাস বজায় রাখুন, কারণ সঠিক সহায়তা ও চিকিৎসা দিয়ে এই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
সর্বশেষে, ইন্ট্রুসিভ চিন্তা এবং OCD সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং স্টিগমা দূর করা জরুরি। সমাজের সমর্থন ও সঠিক তথ্যের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা দ্রুত সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারে। আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নেওয়া সুস্থ জীবনের মূল চাবিকাঠি।



