ব্রিটিশ তথ্য সংস্থা রয়টার্সের বুধবার (২৮ জানুয়ারি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে মার্কিন ডলারের মান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। এই পতন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মনোভাবকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে।
ডলার ইনডেক্স, যা প্রধান ছয়টি মুদ্রার বিপরীতে ডলারের গড় মান নির্ণয় করে, ৯৫.৫৬৬ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এই সংখ্যা ফেব্রুয়ারি ২০২২ থেকে ডলারের সর্বনিম্ন রেকর্ড, যা পূর্বের উচ্চতর মানের তুলনায় প্রায় পাঁচ শতাংশের বেশি হ্রাস নির্দেশ করে।
ডলারের এই দুর্বলতা স্বর্ণের দামে তীব্র উত্থান ঘটিয়েছে; এক আউন্স স্বর্ণের দাম প্রথমবারের মতো $5,200 অতিক্রম করেছে। এই মাইলফলক বৈশ্বিক বাজারে রিয়েল সম্পদে নিরাপত্তা খোঁজার প্রবণতা বাড়িয়ে তুলেছে।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা ডলারের পতনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বেকারত্বের হার, ভোক্তা ব্যয়ের ধীরগতি এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে নীতি নির্ধারকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার আরও কমানোর সম্ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি ডলারের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। সুদের হার হ্রাস করলে ঋণগ্রহীতা সুবিধা পায়, তবে মুদ্রার মান হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ে।
শুল্ক নীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কিত অনিশ্চয়তা, পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এই পরিবেশে নিরাপদ সম্পদে পুঁজি স্থানান্তর দ্রুত হয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা ডলারের তুলনায় স্বর্ণ ও অন্যান্য বাস্তব সম্পদকে অধিক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এই প্রবণতা স্বর্ণের চাহিদা বাড়িয়ে দামের তীব্র উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকে, তবে ডলারের মান আরও হ্রাস পেতে পারে। ফেডারেল রিজার্ভের নীতি দিকনির্দেশনা এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যৎ মুদ্রা গতিবিধির মূল নির্ধারক হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে তিনি ডলারের বর্তমান অবস্থা “দারুণ” বলে প্রশংসা করেন এবং আরও পতন না ঘটতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে তার এই বক্তব্য বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ডলারের অবনতি ত্বরান্বিত হয়েছে।
সিনিয়র বাজার বিশ্লেষক কেলভিন ওং উল্লেখ করেছেন, হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারকরা ভবিষ্যতে ডলারের মানকে কম স্তরে রাখতে চাইতে পারেন, যা স্বর্ণের চাহিদা বাড়িয়ে দেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগের সঞ্চার ঘটিয়েছে।
ডলারের পতনের পর স্বর্ণের দাম মঙ্গলবারে প্রায় তিন শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে $5,200 স্তরে পৌঁছায়, আর বুধবারে তা আরও বাড়ে। এই দ্রুত মূল্য উত্থান বৈশ্বিক পোর্টফোলিওতে রিস্ক ম্যানেজমেন্টের গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরেছে।
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও মুদ্রাস্ফীতি উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের সম্ভাবনা বাড়ছে; ডলারের অবমূল্যায়ন রপ্তানি মূল্য কমিয়ে দিতে পারে, তবে একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতি ত্বরান্বিত করতে পারে। তাই নীতিনির্ধারকদের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল প্রয়োজন, যাতে মুদ্রা স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি দুটোই রক্ষা করা যায়।



