২৬-২৭ জানুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ৯ম ল্যান্ড ফোর্সেস টকস (LFT) ২০২৬ সফলভাবে সমাপ্তি হয়েছে। দুই দেশের সামরিক প্রতিনিধিদল দুদিনব্যাপী আলোচনা শেষে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই বৈঠকটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়।
টকসের প্রথম দিনটি ২৬ জানুয়ারি শুরু হয়, যেখানে ঢাকা সেনানিবাসের সেনা ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের কনফারেন্স রুমকে মূল আলোচনার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয় দিন, ২৭ জানুয়ারি, সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আলোচনার ফলাফল সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রোডম্যাপ নির্ধারিত হয়।
এই টকসটি যুক্তরাষ্ট্রে ৮-১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ অনুষ্ঠিত ৯ম ল্যান্ড ফোর্সেস টকসের পরবর্তী ধাপ হিসেবে পরিকল্পিত হয়। পূর্ববর্তী বৈঠকে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রশিক্ষণ আদান-প্রদান এবং যৌথ মহড়া নিয়ে প্রাথমিক সমঝোতা গড়ে তোলা হয়েছিল, যা এইবারের আলোচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল মোট ২২ সদস্য নিয়ে গঠিত, যার নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সামরিক প্রশিক্ষণ পরিদপ্তরের লে. কর্নেল মোহাম্মদ বদরুল হক। তিনি দলকে সমন্বয় করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নির্ধারণের দায়িত্বে ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চারজন কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন, যার মধ্যে USARPAC (যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক আর্মি কমান্ড) নিরাপত্তা সহযোগিতা বিভাগের মেজর মাইকেল জেকব ওসটার নেতৃত্ব দেন। তাদের দল প্রশিক্ষণ প্রযুক্তি, লজিস্টিক সহায়তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য প্রস্তুত ছিল।
উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে সামরিক প্রশিক্ষণ পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হুমায়ূন কবীর উপস্থিত ছিলেন। তিনি উভয় দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের স্বাগত জানিয়ে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন এবং টকসের সাফল্যের জন্য প্রশংসা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে আলোচনার মূল বিষয়গুলোতে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ আদান-প্রদান, উন্নত প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ব্যবহার, এবং যৌথ মহড়ার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। উভয় পক্ষই প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে উদ্ভাবনী পদ্ধতি গ্রহণ এবং ডিজিটাল সিমুলেশন টুলের ব্যবহার বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়।
বিশেষত, দুই দেশ যৌথ প্রশিক্ষণ ও মহড়ার আয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি তৈরি করতে সম্মত হয়। এতে সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার সুরক্ষা এবং মানবিক সহায়তা অপারেশন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট সংকট মোকাবেলায় সমন্বিত প্রস্তুতির জন্য তথ্য শেয়ারিং মেকানিজম স্থাপন করা হবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের দ্বিপাক্ষিক মিথস্ক্রিয়া দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি শক্তিশালী করে এবং বাংলাদেশকে আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা করে। একই সঙ্গে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলার মাধ্যমে সাইবার হুমকি ও সীমানা লঙ্ঘনের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
টকসের পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে উভয় দেশ ২০২৬ সালের শেষের দিকে একটি যৌথ প্রশিক্ষণ মহড়া পরিচালনা করার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া, নিরাপত্তা সহযোগিতা বিভাগের মাধ্যমে ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা সভা চালু করা হবে, যাতে অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং নতুন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় কৌশল সমন্বয় করা যায়।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ৯ম ল্যান্ড ফোর্সেস টকসের সমাপ্তি উভয় দেশের সামরিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সংকেত দেয়। পারস্পরিক বিশ্বাস, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং যৌথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য স্পষ্ট হয়েছে। ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষই নিয়মিত সংলাপ বজায় রাখবে এবং যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।



