কলকাতা হাইকোর্টের একটি বিভাগীয় বেঞ্চ মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার বেড়া স্থাপনের কাজ দ্রুত শেষ করার আদেশ প্রদান করেছে। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেন এই নির্দেশে স্পষ্টভাবে সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন। আদেশের মূল উদ্দেশ্য হল জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অরক্ষিত সীমান্তভাগে দ্রুত ফেন্সিং কাজ সম্পন্ন করা।
বেঞ্চের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৩১ মার্চের মধ্যে সীমান্ত সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)কে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তর করতে হবে। এই সময়সীমা অতিক্রম করলে আদালত তা অবহেলাপূর্ণ বলে গণ্য করবে। জমি হস্তান্তরের দায়িত্ব এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ওপর, এবং আদালত এই দায়িত্বের দ্রুত সম্পাদনকে বাধ্যতামূলক করেছে।
কেন্দ্র সরকার ইতিমধ্যে কাঁটাতার নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে এবং নির্দিষ্ট জমি অধিগ্রহণের জন্য তহবিল বরাদ্দ করেছে। তবে রাজ্য সরকার জমি সরবরাহে দেরি করার অভিযোগ কেন্দ্রীয় সরকার আদালতে তুলেছে। এই প্রেক্ষিতে আদালত রাজ্যের ভূমিকা ও দায়িত্ব স্পষ্ট করতে চেয়েছে।
সীমান্তের অরক্ষিত অংশ দীর্ঘদিন ধরে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান সমস্যার সৃষ্টি করছিল। এই সমস্যার সমাধানে কাঁটাতার বেড়া গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উভয় দেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।
কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে জমি হস্তান্তর নিয়ে বিরোধের মূল কারণ হল রাজ্য সরকারের ইচ্ছাকৃত দেরি। কেন্দ্রীয় সরকার আদালতে দাবি করে যে, তহবিল বরাদ্দের পরেও রাজ্য যথাযথভাবে জমি সরবরাহে অগ্রসর হয়নি। এই বিষয়টি বিচারপতিদের দৃষ্টিতে গুরুতর অবহেলা হিসেবে দেখা হয়েছে।
শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জিজ্ঞাসা করেন কেন জাতীয় নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। তিনি উল্লেখ করেন যে, কোনো প্রশাসনিক অজুহাত এই গুরুত্বপূর্ণ কাজকে বিলম্বিত করতে পারে না।
আদালত স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, ‘সোশ্যাল ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ বা সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের নামে দাপ্তরিক অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। এমন অজুহাতের ভিত্তিতে কাজের সময়সীমা বাড়ানোকে আদালত অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছে।
প্রায় ১৮০ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতার বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে এবং এর জন্য কেন্দ্র ইতিমধ্যে রাজ্যকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। এই তহবিলের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার প্রত্যাশা করা হয়।
যেসব এলাকায় এখনো রাজ্য মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া যায়নি, সেখানে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব কি না, তা নির্ধারণের জন্য উভয় পক্ষকে বিস্তারিত হলফনামা জমা দিতে বলা হয়েছে। এই হলফনামা জমা না দিলে আদালত কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।
বিচারপতিরা জোর দিয়ে বলেন যে, সীমান্তের নিরাপত্তা কেবল একটি প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মৌলিক দিক। তাই কোনো আইনি জটিলতা বা প্রক্রিয়াগত বিলম্ব এই কাজকে বাধা দিতে পারবে না।
আদালতের এই নির্দেশনা মানা না হলে সীমান্তে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের ঝুঁকি বাড়বে এবং নিরাপত্তা সংস্থার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হবে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক সীমানার সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে কোনো দেরি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।
পরবর্তী ধাপে বিএসএফকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমি গ্রহণ করে কাঁটাতার স্থাপন কাজ শুরু করতে হবে। রাজ্য সরকারকে দ্রুত জমি হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছে। কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে আদালত নিয়মিত রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে।
এই আদেশের ফলে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচিত হতে পারে, যেখানে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে কেন্দ্রীয় সরকারের ত্বরান্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। রাজ্য সরকারকে ভবিষ্যতে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দেরি না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
সীমান্তে কাঁটাতার বেড়া গঠন সম্পন্ন হলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং অনুপ্রবেশের ঝুঁকি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। আদালতের কঠোর নির্দেশনা এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করবে।



