২০২২ সালে রাশিয়াকে SWIFT পেমেন্ট নেটওয়ার্ক থেকে বাদ দেওয়া আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই পদক্ষেপটি মূলত ইউক্রেনের সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় নেওয়া একটি নিষেধাজ্ঞা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল, তবে তা বিশ্বব্যাপী আর্থিক লেনদেনের নির্ভরযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্বের প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাশিয়ার ব্যাংকগুলোকে সিস্টেমে প্রবেশ থেকে বাধা দিয়ে তাদের আন্তর্জাতিক পেমেন্টের সক্ষমতা সীমিত করে। ফলে রাশিয়া ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহার করা পদ্ধতিগুলোতে লেনদেন করতে পারছিল না, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবাহে অপ্রত্যাশিত বাধা সৃষ্টি করে।
এই ঘটনাটি আর্থিক সিস্টেমকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। পূর্বে SWIFT একটি নিরপেক্ষ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করত, যেখানে দেশগুলো স্বাভাবিকভাবে লেনদেন সম্পন্ন করত। রাশিয়ার বিচ্ছিন্নতা এই ধারণাকে ক্ষয় করে, এবং অন্যান্য দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে যে ভবিষ্যতে তাদেরও অনুরূপ নিষেধাজ্ঞার শিকার হতে পারে।
বিশ্বাসের এই ক্ষয় আর্থিক বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অংশীদাররা এখন লেনদেনের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিয়ে পুনর্বিবেচনা করছে, ফলে পেমেন্টের বিকল্প পদ্ধতি, যেমন ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বেসরকারি ক্লিয়ারিং নেটওয়ার্ক, দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো স্বল্পমেয়াদে লিকুইডিটি সংকটের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোও রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল সেক্টরে ক্ষতি অনুভব করেছে। রাশিয়া-ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা শক্তি, ধাতু ও কৃষি পণ্যের রপ্তানিতে প্রভাব ফেলেছে। ফলে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে বাধ্য হয়েছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া নিজেই বিকল্প পেমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে, যার মধ্যে চীনের CIPS (Cross-Border Interbank Payment System) অন্তর্ভুক্ত। যদিও এই নেটওয়ার্কগুলো এখনো SWIFT-এর মতো বিস্তৃত নয়, তবে তাদের দ্রুত বিকাশ আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর বহুমুখীতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংস্থাগুলো এখন এই নতুন বাস্তবতায় কিভাবে সাড়া দেবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংক রাশিয়ার বিচ্ছিন্নতা থেকে উদ্ভূত ঝুঁকি মোকাবেলায় নীতি নির্দেশনা প্রদান করেছে, তবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এখনও নির্ধারিত হয়নি।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, আর্থিক সিস্টেমের নিরপেক্ষতা পুনরুদ্ধার না হলে ভবিষ্যতে আরও দেশকে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হতে পারে। এতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের খরচ বাড়বে এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাবে।
অর্থনৈতিক প্রবাহের এই অস্থিরতা মুদ্রা বাজারেও প্রতিফলিত হয়েছে। রাশিয়ান রুবল ও ইউরোর মানে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোর মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকি হেজ করার জন্য বৈচিত্র্যপূর্ণ পোর্টফোলিও গঠন করতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পরিস্থিতি আর্থিক প্রযুক্তি (FinTech) কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বিকেন্দ্রীভূত লেজার প্রযুক্তি ও ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করে নিরাপদ লেনদেনের চাহিদা বাড়ছে, যা ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে, আন্তর্জাতিক আর্থিক নিয়মাবলীর পুনর্গঠন প্রয়োজনীয় হতে পারে। দেশগুলোকে একসাথে কাজ করে পেমেন্ট নেটওয়ার্কের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো একক দেশ বা গোষ্ঠী সিস্টেমকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে না পারে।
সারসংক্ষেপে, রাশিয়ার SWIFT থেকে বিচ্ছিন্নতা আর্থিক সিস্টেমের ওপর বিশ্বাসের ক্ষয় ঘটিয়েছে, যা বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। এই পরিবর্তনগুলোকে মোকাবেলায় বিকল্প পেমেন্ট পদ্ধতি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন, যাতে বৈশ্বিক বাণিজ্য স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।



