বিশ্বব্যাপী মুদ্রা বাজারে ডলারের মূল্য প্রধান ছয়টি মুদ্রার তুলনায় চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। একই সময়ে স্বর্ণের দাম দ্রুত বাড়ে, দুই দিন আগে এক আউন্সে পাঁচ হাজার ডলার সীমা অতিক্রম করেছে। এই দুইটি প্রবণতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গতিপথে প্রভাব ফেলছে।
স্বর্ণের দাম গতকালও উর্ধ্বমুখী রইল, এক আউন্সে $5,000 ছাড়িয়ে গিয়ে ঐতিহাসিক শীর্ষে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকরা এটিকে মুদ্রা অবমূল্যায়নের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন, যেখানে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডলার সূচক, যা ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের শক্তি মাপা হয়, ৯৫.৫৬৬ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এই সংখ্যা ফেব্রুয়ারি ২০২২ পরের সর্বনিম্ন স্তর, যা বাজারে ডলারের দুর্বলতা স্পষ্ট করে। সূচকের এই পতন আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে শেয়ারহোল্ডারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে।
ডলারের অবমূল্যায়নের পেছনে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাজারে আশা করা হচ্ছে যে ফেডারেল রিজার্ভ অতিরিক্ত রেট কাটের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারে। এই প্রত্যাশা ডলারের চাহিদা হ্রাসের দিকে নিয়ে গেছে।
শুল্ক নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক নীতিনির্ধারণে অস্থিরতা আরেকটি চাপের উৎস। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি ও শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন সম্পর্কে স্পষ্ট দিকনির্দেশের অভাব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ডলারের প্রতি আস্থা কমে গিয়েছে।
ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে সম্ভাব্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা এবং ক্রমবর্ধমান ফেডারেল রিজার্ভের বাজেট ঘাটতি বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। রাজস্ব ঘাটতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারী ঋণ বাড়ছে, যা মুদ্রার স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই বিষয়গুলো ডলারের অবমূল্যায়নে ভূমিকা রাখছে।
বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তারা মনে করছেন যে দীর্ঘমেয়াদে ডলারের মান হ্রাস পেতে পারে, যা বৈশ্বিক পুঁজি প্রবাহকে প্রভাবিত করবে। এই মনোভাব মুদ্রা বাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা যোগ করেছে।
ডলারের অবমূল্যায়ন যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারকদের জন্য স্বল্পমেয়াদে সুবিধা বয়ে আনছে। দুর্বল ডলার আন্তর্জাতিক বাজারে আমেরিকান পণ্যের দাম কমিয়ে তুলেছে, ফলে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। তবে এই সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রা ও বাণিজ্য ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডলারের বর্তমান অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করেন, তিনি ডলারের অতিরিক্ত পতন না চেয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চান। তিনি ডলারের মূল্যকে “ভালো অবস্থায়” বলে উল্লেখ করেন এবং বাজারে হস্তক্ষেপ না করার ইঙ্গিত দেন। তার এই অবস্থান নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর ডলার ইনডেক্স আরও নিচে নেমে যায়, যা বাজারে তার বক্তব্যের তাত্ক্ষণিক প্রভাবকে প্রকাশ করে। সূচকের পতন ট্রাম্পের কথা শোনার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। ফলে ডলারের অবমূল্যায়ন ত্বরান্বিত হয়।
ট্রাম্পের বক্তব্যে চীন ও জাপানের সঙ্গে প্রতিযোগিতার উল্লেখও করা হয়, যা তার বাণিজ্য নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। তিনি পূর্বের কঠোর লড়াইয়ের কথা স্মরণ করে বর্তমান কৌশলগত অবস্থানকে তুলে ধরেন। এই প্রসঙ্গ ডলারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনাকে উন্মুক্ত করে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে ডলারের অবমূল্যায়ন যদি ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে, তবে বৈশ্বিক মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে এবং নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফেডারেল রিজার্ভের নীতি দিকনির্দেশনা, যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনগুলো ভবিষ্যৎ প্রবণতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাজারের অংশগ্রহণকারীদের জন্য এই বিষয়গুলো নজরে রাখা জরুরি।



