নবম জাতীয় বেতন কমিশন গত সপ্তাহে জমা দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিভিল সার্ভেন্টদের বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এই প্রস্তাবের লক্ষ্য হল দশ বছর ধরে বেতন সংশোধনের অভাব এবং মুদ্রাস্ফীতির ফলে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের ক্ষতিপূরণ করা। তবে, ২০২৪ সালের উত্থানের পর বাংলাদেশ সরকার যে সংকুচিত আর্থিক নীতি গ্রহণ করেছে, তার সঙ্গে এই বিশাল বেতন বৃদ্ধি প্রস্তাবের বৈপরীত্য স্পষ্ট।
অস্থায়ী সরকার বর্তমানে ব্যয় কমিয়ে, উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা হ্রাস করে এবং মুদ্রা সরবরাহকে সঙ্কুচিত করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এই অর্থনৈতিক সংকোচনকে ত্বরান্বিত করতে, সরকার বাজেটের অন্যান্য খাতে কাটছাঁট চালিয়ে যাচ্ছে, যার মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের জন্য কেবল টাক ৫০১ কোটি মাত্র অনুমোদন করা হয়েছে।
বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত টাক ১.০৬ লাখ কোটি বার্ষিক ব্যয় প্রয়োজন হবে। বর্তমানে সরকার টাক ১.৩১ লাখ কোটি ব্যয় করে ১৪ লক্ষ কর্মচারী ও নয় লক্ষ অবসরপ্রাপ্তদের বেতন ও পেনশন প্রদান করে। অর্থাৎ, প্রস্তাবিত বৃদ্ধি বর্তমান ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের সমান, যা সরকারি আর্থিক ভারকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে।
প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ বর্তমান আর্থিক বছরের জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় ২.৫ গুণ, আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মোট বাজেটের ৪৪ শতাংশের সমান। এডিপি ইতিমধ্যে ঘাটতি কমাতে ১৩.২ শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে, ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় বাজেটের ভারসাম্যকে আরও কঠিন করে তুলবে। সরকারী অপারেটিং ব্যয়ের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এই বেতন বৃদ্ধিতে গিয়ে যাবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মানসুর এই প্রস্তাবের ওপর কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি ব্যবসা সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেন যে, এমন বিশাল বেতন বৃদ্ধি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। তার মন্তব্যের পর সরকারী দপ্তর থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশিত হয়নি।
বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবের ফলে রাজনৈতিক পরিসরে উত্তেজনা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সরকারী ব্যয় সংকোচনের সময়ে সিভিল সার্ভেন্টদের জন্য এ ধরনের বড় বৃদ্ধি অনুমোদন করা হলে, বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের কাছ থেকে আর্থিক অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সংসদে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এবং ভোটের সম্ভাবনা উঁচু, যা সরকারের বাজেট নীতি এবং জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ সরকারকে বেতন বৃদ্ধি ও আর্থিক সংকোচনের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখতে হবে, নতুবা বাজেট ঘাটতি বাড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি পুনরায় তীব্র হতে পারে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হবে, তা দেশের আর্থিক নীতি ও জনসাধারণের স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল।



