রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২-এ শুরু হওয়া সংঘর্ষের চতুর্থ বর্ষে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উভয় পক্ষের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মোট সংখ্যা ১৮ লাখের বেশি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এই সংখ্যা মৃত, গুরুতরভাবে আহত এবং নিখোঁজ সৈন্যদের সমন্বয়ে গঠিত এবং চার বছরের গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১২০ জনের বেশি প্রাণহানি ঘটেছে।
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি ইউক্রেনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যেখানে মোট ১২ লাখের বেশি রাশিয়ান সৈন্যের মৃত্যু, আঘাত বা নিখোঁজের রেকর্ড রয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার মৃত্যুর সংখ্যা ৩ লাখ ২৫ হাজারের উপরে, যা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এক বিরল পরিসংখ্যান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ইউক্রেনের ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি কম হলেও তবু তীব্র, কারণ চার বছরের মধ্যে অন্তত ৬ লাখ সৈন্যের মৃত্যু, আঘাত বা নিখোঁজের রিপোর্ট রয়েছে। CSIS আরও উল্লেখ করেছে যে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউক্রেনীয় বাহিনীর ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার সৈন্যের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।
বাকি থাকা বড় অংশের সৈন্যরা গুরুতর আঘাত পেয়ে চিকিৎসাাধীন, আর কয়েক হাজারেরও বেশি সৈন্য এখনও নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত। উভয় পক্ষের জন্য এই বিশাল মানবিক ক্ষতি সামরিক কৌশল ও যুদ্ধের প্রকৃতিকে পুনর্গঠন করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
CSIS এই তথ্যকে আধুনিক সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছে, যেখানে প্রচলিত যুদ্ধের তুলনায় মানবশক্তির ক্ষয় দ্রুতগতিতে ঘটছে। বিশ্লেষকরা বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ধরণের ক্ষয়জনিত প্রভাব উভয় দেশের জনসংখ্যা গঠনে এবং সামাজিক কাঠামোতে গভীর পরিবর্তন আনবে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বড় অংশের ক্ষতি শ্রমশক্তি এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় ফাঁক তৈরি করবে বলে সতর্কতা প্রকাশ করা হয়েছে। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের ফলে উৎপাদনশীল বয়সের জনসংখ্যা হ্রাস পাবে, যা অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে জটিল করে তুলবে।
সামরিক বাহিনীর সংখ্যা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ই নতুন নিয়োগ এবং উচ্চপ্রযুক্তি ভিত্তিক অস্ত্র ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, সাইবার যুদ্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিখা যুদ্ধের ব্যবহার বাড়ছে, যা মানবিক ক্ষতি কমাতে না পারলেও যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তন করছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেন, এই ধারা চলতে থাকলে উভয় দেশই নতুন নিয়োগ নীতি ও আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর কৌশল গ্রহণে বাধ্য হবে। একই সঙ্গে ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় যুদ্ধের সমাপ্তি এখনও স্পষ্ট নয়, এবং পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে ২০২৬ সালের শীতকালীন শীর্ষ সম্মেলনকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, চার বছরের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ১৮ লাখের সীমা অতিক্রম করেছে, যার মধ্যে রাশিয়ার মৃত্যুর সংখ্যা ৩ লাখের বেশি এবং ইউক্রেনের মৃত্যুর সংখ্যা ১ লাখের কাছাকাছি। এই মানবিক মূল্যবোধের ক্ষতি কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং জনসংখ্যাতাত্ত্বিক দিকেও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে, যা উভয় দেশের ভবিষ্যৎ নীতি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপকে প্রভাবিত করবে।



